থাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলায় ১৭২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার গঠন করা হয়নি। জাতীয় শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ৭৩ বছর পার হলেও ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে এই স্মারক অনুপস্থিত। ফলে ২১ ফেব্রুয়ারি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেই সমবেত হতে হয়।
হরিপুর উপজেলা মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় মোট ১৮৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের মধ্যে সাধারণ কলেজ আটটি, বিএম কলেজ একটি এবং কৃষি কলেজ একটি। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় পঞ্চাশটি, মাদ্রাসা চৌদ্দটি, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চারটি এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি সংযুক্ত) একটি অন্তর্ভুক্ত।
মাধ্যমিক ও সমমানের ৬৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র সাতটিতে শহীদ মিনার রয়েছে। এই সাতটি প্রতিষ্ঠান হল হরিপুর সরকারি মোসলেম উদ্দিন কলেজ, বিএম কলেজ, কেবি কলেজ, যাদুরনী উচ্চ বিদ্যালয়, চৌরঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয়, আর.এ. কাঠালডাঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয় এবং পাঁচঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়।
তবে সরেজমিনে করা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ শহীদ মিনারই অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে; কাঠামো ক্ষয়প্রাপ্ত এবং ব্যবহারযোগ্য নয়।
উপজেলায় মোট ১১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র দশটিতে শহীদ মিনার গড়ে তোলা হয়েছে। বাকি একশোটি বিদ্যালয়ে এই স্মারক অনুপস্থিত, ফলে ছোট বয়সের শিক্ষার্থীরা ভাষা শহীদদের স্মরণে কেন্দ্রীয় স্থানে যেতে বাধ্য।
২০১৬ সালে উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসনের উদ্যোগে আমাই দিঘীর পাড়ায় একটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মিত হয়। এই স্থানে উপজেলা প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং আশপাশের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ভাষাপ্রেমীরা এই অবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে। তারা দাবি করেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে এবং নতুন প্রজন্মকে ঐতিহাসিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার গঠন অপরিহার্য।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রায়হানুল ইসলাম মিঞা এবং প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুলতান সালাহ উদ্দিন এ বিষয়ে মন্তব্য করেন যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ও পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী ও শিক্ষাবিদরা তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ চালু করেছে। কিছু বিদ্যালয়ে স্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে দানও পাওয়া গেছে।
শহীদ মিনার না থাকা বিদ্যালয়গুলোতে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শিক্ষার্থীদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছানো কঠিন। কেন্দ্রীয় মিনার পর্যন্ত দূরত্ব, পরিবহন সমস্যা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে অনেক শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারে না।
শিক্ষা বিভাগের দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্মারক গঠন শিক্ষার্থীদের জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলতে সহায়ক। এছাড়া, শহীদ মিনার শিক্ষামূলক কার্যক্রম, যেমন ভাষা শিখন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আয়োজনের স্থান হিসাবেও কাজ করতে পারে।
অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে প্রস্তাব করা হয় যে, অনুপস্থিত মিনারগুলোর তালিকা তৈরি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্মাণ পরিকল্পনা চালু করা হোক। তদুপরি, বিদ্যমান মিনারগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
আপনার বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার আছে কি? যদি না থাকে, তবে শিক্ষকমণ্ডলী ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে এই স্মারক গঠন করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে।



