মরক্কো ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কুকুর হত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক প্রাণী কল্যাণ সংস্থার তীব্র নিন্দা মুখোমুখি হয়েছে। অভিযোগে বলা হচ্ছে, প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শহরের রাস্তায় অবস্থিত অবাঞ্ছিত কুকুরগুলোকে ব্যাপকভাবে নির্মূল করা হচ্ছে, যা লক্ষ লক্ষ প্রাণীর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দেশগুলোর মধ্যে স্পেন, পর্তুগাল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে এবং প্যারাগুয়ে অন্তর্ভুক্ত, আর মরক্কোই এই সমাবেশের মূল ভিত্তি। এই বহুমুখী আয়োজনের জন্য শহর ও অবকাঠামো পরিষ্কার করা প্রয়োজন বলে দাবি করা হয়, তবে কুকুর হত্যার পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক প্রাণী কল্যাণ ও সংরক্ষণ কোয়ালিশন (IAWPC) জানিয়েছে, যদি বর্তমান প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে তবে প্রায় তিন মিলিয়ন কুকুর প্রাণীহীন হয়ে যেতে পারে। সংস্থা উল্লেখ করেছে, মরক্কোর কিছু এলাকায় কুকুরের সংখ্যা হঠাৎ বাড়ার পর থেকে হত্যার হার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে, যা মানবিক ও পরিবেশগত নীতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ।
ডেইলি মেইল প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কুকুর হত্যা করার জন্য স্ট্রাইকাইন বিষ ব্যবহার, গুলি চালানো এবং এমনকি কিছু কুকুরকে সরাসরি জ্বালিয়ে মারা সহ বিভিন্ন নিষ্ঠুর পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। এসব কাজের মূল উদ্দেশ্যকে রাস্তায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক পর্যটক ও ক্রীড়া প্রতিনিধিদের স্বাগত জানাতে শহরকে প্রস্তুত করা বলা হয়েছে।
মরক্কোর রাজধানী রাবাতের শহর কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। শহর প্রশাসনের মতে, কোনো কুকুর নিধনের কার্যক্রম চালু নেই এবং শহরের স্যানিটেশন পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে মানবিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে।
লন্ডনে মরক্কোর দূতাবাসের মুখপাত্রও একই রকম অবস্থান গ্রহণ করে জানান, দেশটি প্রাণী ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে টেকসই ও মানবিক নীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং কোনো ধরনের অবৈধ কুকুর হত্যা নেই। দূতাবাসের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ভবঘুরে প্রাণীর সঙ্গে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন রকমের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গৃহীত হচ্ছে।
IAWPC-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মরক্কো বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে কুকুর নিধনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে তবে তিন মিলিয়ন কুকুরের মৃত্যুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারে।
হলিউডের অভিনেতা মার্ক রাফালো এই পরিস্থিতিকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করে মন্তব্য করেছেন, “একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টের প্রস্তুতির জন্য লক্ষ লক্ষ কুকুরকে হত্যা করা কোনো অগ্রগতি নয়।” তার এই বক্তব্য সামাজিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
মার্টিনেজের বিশ্বকাপ জয়ের পদক রক্ষায় ব্যবহৃত কুকুরের ঘটনা ২ জানুয়ারি ২০২৩-এ প্রকাশিত হয়, যেখানে ২৪ লাখ টাকার মূল্যমানের কুকুরকে নিরাপদে রক্ষা করা হয়েছিল। এই ঘটনা ক্রীড়া জগতের প্রাণী সংরক্ষণ সংক্রান্ত আলোচনাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে।
ক্রীড়া ভিত্তিক পোর্টাল দ্য অ্যাথলেটিকের সাংবাদিক সাইমন হিউজের অনুসন্ধানে দেখা যায়, দশটি স্বতন্ত্র সংস্থা IAWPC-কে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে তারা সতর্ক করেছে যে, কুকুর হত্যার কার্যক্রম শুধুমাত্র জাতীয় আইনের লঙ্ঘন নয়, টিএনভিআর (ট্র্যাপ-নিউট্রালাইজ-রিলিজ) প্রকল্পের তহবিল বরাদ্দ নীতিরও বিরোধী।
সংস্থাগুলো আরও উল্লেখ করেছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে রাস্তায় অবস্থিত প্রাণীকে হত্যা, নির্যাতন বা আঘাত করে, তবে দেশের শাস্তি বিধান অনুযায়ী কারাদণ্ড এবং জরিমানা আরোপিত হতে পারে। এই আইনগত বিধান কুকুর হত্যার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
বিশ্বকাপের সময়সূচি এখনও নির্ধারিত রয়েছে, এবং মরক্কো সরকার প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক প্রাণী সংস্থার সতর্কতা এবং মানবিক প্রাণী ব্যবস্থাপনা দাবির মুখে দেশটি কীভাবে তার নীতি সমন্বয় করবে, তা ভবিষ্যতে ক্রীড়া ও পরিবেশ সংরক্ষণের আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।



