১৯৭৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কলকাতা শহরে প্রকাশিত ‘জানা আরণ্য’ চলচ্চিত্রটি সৎযজিৎ রায়ের পরিচালনায় তৈরি, যা মানি শঙ্কর মুখার্জীর একই নামের উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে। এই কাজটি শহুরে মধ্যবিত্তের জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে এবং আজও দর্শকদের কাছে গভীর প্রভাব ফেলছে।
সত্যজিৎ রায়, বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম দৃষ্টান্তমূলক নির্মাতা, তার কাজের মাধ্যমে সমাজের গোপন দিকগুলোকে উন্মোচন করতে পারদর্শী ছিলেন। তিনি মানব মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণকে সিনেমার ফ্রেমে গড়ে তুলতে পারদর্শী ছিলেন, যা ‘জানা আরণ্য’ তেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
উপন্যাসের লেখক মানি শঙ্কর মুখার্জি, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর, তার রচনায় নগর জীবনের জটিলতা ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে চিত্রিত করেছেন। রায়ের চলচ্চিত্রে এই উপন্যাসের মূল ভাবনা সঠিকভাবে রূপান্তরিত হয়েছে।
চলচ্চিত্রটি ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথমবার প্রদর্শিত হয় এবং তৎকালীন সময়ে সমালোচকদের কাছ থেকে উচ্চ প্রশংসা পায়। যদিও বাণিজ্যিক দিক থেকে বড় হিট না হলেও, তার শিল্পমূল্য ও সামাজিক বার্তা দীর্ঘদিন টিকে রয়েছে।
‘জানা আরণ্য’ এর কেন্দ্রীয় বিষয় হল জীবনের কঠিন বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত নৈতিকতার ক্ষয়। এটি কোনো নায়ক বা খলনায়কের গল্প নয়, বরং সাধারণ যুবকের সংগ্রামকে তুলে ধরে, যিনি নিজের স্বপ্ন ও সমাজের চাহিদার মধ্যে দ্বন্দ্বে পড়ে।
প্রধান চরিত্র সোমনাথ, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, শিক্ষিত কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগে সীমাবদ্ধ। তার জীবনের পথে বাধা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক প্রত্যাশা তাকে ধীরে ধীরে আত্মসমর্পণের দিকে ঠেলে দেয়।
সোমনাথের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন প্রদীপ মুখার্জি, যিনি নীরব কিন্তু গভীর আবেগের মাধ্যমে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দুঃখকে প্রকাশ করেছেন। তার অভিনয় শৈলী চরিত্রের নীরব সংগ্রামকে সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করে।
চলচ্চিত্রে কলকাতাকে রূপকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে পুরনো গলিগুলোর গুঞ্জন ও আধুনিকতা একসাথে মিশে আছে। রায় শহরের যান্ত্রিকতা ও মানবিক বিচ্ছিন্নতাকে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, যা দর্শকের কাছে শহরের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
‘জানা আরণ্য’ সত্যজিৎ রায়ের কলকাতা ত্রয়ীর শেষ অংশ, যা ‘প্রতিদ্বন্দ্বি’ এবং ‘সীমাবদ্ধা’ এর পরবর্তী ধারাবাহিকতা। এই ত্রয়ী শহরের বিভিন্ন দিক—বিপ্লব, নৈতিক আত্মসমর্পণ এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ—কে একসাথে বিশ্লেষণ করে।
প্রতিদ্বন্দ্বি চলচ্চিত্রে যুবকের বিদ্রোহের চিত্র, সীমাবদ্ধা-তে সাফল্যের মুখোশে নৈতিক অবনতি, আর জানা আরণ্য-তে আত্মসমর্পণের অবসান—এই তিনটি কাজ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, যা রায়ের নগর সমাজের গভীর বিশ্লেষণকে প্রকাশ করে।
পঞ্চাশ বছর পার হওয়ার পরও এই চলচ্চিত্রের বার্তা ততটাই প্রাসঙ্গিক, কারণ আধুনিক কর্মসংস্থান বাজারে তরুণরা এখনও একই ধরনের নৈতিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। স্বপ্নের পথে বাধা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক প্রত্যাশা আজও সমানভাবে বিদ্যমান।
দর্শকদের জন্য এই চলচ্চিত্রটি শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতি নয়, বরং বর্তমানের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এটি দেখার মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবনের মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্তের গুরুত্ব পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা প্রেমিক ও নতুন দর্শক উভয়েরই এই কাজটি দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে তারা নগর জীবনের জটিলতা ও মানবিক দিকের সূক্ষ্মতা অনুভব করতে পারে।
সংক্ষেপে, ‘জানা আরণ্য’ একটি সময়ের চিত্রণ নয়, বরং মানবিক আত্মসমর্পণ ও নৈতিক চ্যালেঞ্জের চিরন্তন অনুসন্ধান, যা আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্যও প্রাসঙ্গিক ও শিক্ষামূলক।



