বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ইরানের নামী পরিচালক জাফর পানাহি উপস্থিত হয়ে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা সম্পর্কে সতর্কবার্তা জানিয়েছেন। তিনি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা পরিচালিত ব্যাপক দমনমূলক অভিযানের ফলে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়কে “অবিশ্বাস্য অপরাধ” বলে বর্ণনা করেছেন।
পানাহি, যিনি “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান এক্সিডেন্ট” এবং “ট্যাক্সি” ছবির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন, ২০১৫ সালে বার্লিনের গোল্ডেন বেয়ার পুরস্কার জিতেছিলেন। তবে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই সময়ে তিনি উৎসবে অংশ নিতে পারেননি। এই বছরেও উৎসবের আয়োজকরা তাকে পুরস্কারটি পুনরায় প্রদান করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
পানাহি জানান, পুরস্কার গ্রহণের মাধ্যমে দৃষ্টি সরিয়ে দেশের ভয়াবহ বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর হিংসা হাজার হাজার মানুষের প্রাণ নিয়ে গেছে এবং বহু পরিবারকে শোকের মুহূর্তে বাধা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষকে তাদের প্রিয়জনের শোক প্রকাশের মৌলিক অধিকারই নাকচ করা হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর জোরপূর্বক হিংসা আরোপের ফলে নাগরিকরা স্বেচ্ছায় কোনো সহিংসতা করতে চায় না, তবে সরকারই তাদের ওপর এই সহিংসতা চাপিয়ে দিচ্ছে।
পানাহি স্বীকার করেন যে তিনি কখনো নিজেকে “রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাতা” হিসেবে চিহ্নিত করতে পছন্দ করেন না, যদিও তার কাজ ও ব্যক্তিগত জীবন উভয়ই রাষ্ট্রের দমন নীতির প্রভাবের অধীন। বর্তমান পরিস্থিতিতে নীরব থাকা আর সম্ভব নয়, কারণ শিল্পীরা সামাজিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না।
তিনি বলেন, শিল্পীরা স্বাভাবিকভাবে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে চায় না, তবে সরকারই তাদেরকে রাজনৈতিক আলোচনায় বাধ্য করে। “শিল্পীরা সমাজের ঘটনার প্রতি নীরব থাকতে পারে না,” তিনি যুক্তি দেন, এবং এই নীরবতা ভাঙতে শিল্পীদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
ইরানের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা একই সময়ে একটি সমান্তরাল ক্যাম্পেইন চালু করেছেন, যার লক্ষ্য দেশের দমনমূলক নীতি দ্বারা নিহত ও আটক হওয়া শিল্পীদের সমস্যাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র উৎসবে ইরানীয় শিল্পীদের দুর্ভোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে চায়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানে ব্যাপক প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন দেখা গেছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই দমনমূলক কার্যক্রমে দশ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ গ্রেফতার করা হয়েছে। শিল্পী সম্প্রদায়ের ওপরও একই রকম চাপ বাড়ছে; বহু পরিচালক, অভিনেতা ও সঙ্গীতশিল্পী গ্রেফতার বা বিচারের মুখে।
বার্লিন উৎসবে পানাহির এই বক্তব্যের পর অন্যান্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাতারাও ইরানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। কিছু চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজকরা ইরানের শিল্পী বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশের জন্য বিশেষ সেশন ও প্যানেল আলোচনা আয়োজনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন।
পানাহি এবং তার সহকর্মীরা আশা প্রকাশ করছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ইরানের সরকারকে মানবিক নীতিমালা মেনে চলতে বাধ্য করবে। তারা জোর দিয়ে বলেন, শিল্পের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য বিশ্বব্যাপী একতাবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন, নতুবা ইরানের জনগণ দীর্ঘমেয়াদী নিপীড়নের শিকারে রয়ে যাবে।



