ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বৃহস্পতিবার ভারত সফরের শেষ দিনে, দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন পর্যায়ের সূচনা হিসেবে রাফাল যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার যৌথ উৎপাদনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিন দিনের সফর শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়ে বলেন, এই উদ্যোগটি ফ্রান্স ও ভারতের কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে।
ম্যাক্রোঁ উল্লেখ করেন, ভারত ইতিমধ্যে রাফাল যুদ্ধবিমানের ১১৪টি অতিরিক্ত ইউনিট ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দুই দেশের পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। বর্তমান সময়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর মোট রাফাল সংখ্যা ৩৬, এবং এই নতুন ক্রয় পরিকল্পনা তা দ্বিগুণের কাছাকাছি বাড়াবে।
রাফাল চুক্তি ও যৌথ উৎপাদনের নির্দিষ্ট শর্তাবলী এখনো প্রকাশিত হয়নি; তবে সূত্র অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক আলোচনার সমাপ্তির পর চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। এই প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষের ইঞ্জিনিয়ারিং দল এবং শিল্প সংস্থাগুলি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমানের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৩.২৫ ট্রিলিয়ন রুপি, যা প্রায় ৩৫.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। এই পরিমাণের চুক্তি ফ্রান্সের জন্য এশিয়ার অন্যতম বড় রপ্তানি হিসেবে বিবেচিত হবে এবং ভারতের সামরিক আধুনিকীকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন, ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল ইতিমধ্যে বিমানবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত ১১৪টি রাফাল ক্রয়ের প্রাথমিক অনুমোদন প্রদান করেছে। একই সভায় অন্যান্য যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের নীতিগত সমর্থনও নিশ্চিত করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও সমন্বিত সরবরাহ চেইন গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
ফ্রান্স ও ভারতের এই যৌথ উদ্যোগটি কেবল দু’দেশের শিল্প সহযোগিতাকে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্গঠন করার সম্ভাবনা তৈরি করে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, কয়েক দশকের পর পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা শীর্ষে পৌঁছানোর পর এই সিদ্ধান্তটি অঞ্চলীয় ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, রাফাল যুদ্ধবিমানের উৎপাদন ক্ষমতা ভারতীয় মাটিতে স্থাপন করলে সরবরাহের সময়সীমা কমে যাবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচও হ্রাস পাবে। এছাড়া, হেলিকপ্টার উৎপাদনের সমন্বয় উভয় দেশের বেসামরিক ও সামরিক সেক্টরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই চুক্তি ফ্রান্সের ইউরোপীয় নিরাপত্তা নীতি এবং ভারতের ‘অ্যাক্ট-ইন্ডিয়া’ কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উভয় দেশই বৈশ্বিক শক্তি সমন্বয়ের মাধ্যমে তৃতীয় দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখতে চায়।
ম্যাক্রোঁের মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, রাফাল প্রকল্পের প্রযুক্তিগত অংশে ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা এবং ভারতের উৎপাদন ক্ষমতা একত্রিত হয়ে একটি মডেল তৈরি করবে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য সামরিক প্ল্যাটফর্মের যৌথ উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য উভয় দেশের শিল্প মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা বিভাগগুলোকে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করতে হবে। চুক্তির চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার আগে, সরবরাহ শর্ত, স্থানীয় অংশীদারিত্বের শর্তাবলী এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে, রাফাল যুদ্ধবিমানের মোট মূল্যের বড় অংশ ভারতীয় রুপি হিসেবে নির্ধারিত হওয়ায়, এটি দুই দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে, ফ্রান্সের এয়ারোস্পেস শিল্পের জন্য নতুন বাজারের উন্মুক্ততা নিশ্চিত হবে।
সামগ্রিকভাবে, ফ্রান্স ও ভারতের রাফাল যৌথ উৎপাদন প্রকল্পটি কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক স্তরে বহু মাত্রিক প্রভাব ফেলবে। এই উদ্যোগের পরবর্তী ধাপগুলোতে প্রযুক্তিগত চুক্তি স্বাক্ষর, উৎপাদন সুবিধার স্থাপন এবং প্রথম ইউনিটের ডেলিভারির সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা কীভাবে বিকশিত হবে, তা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন গতিবিধি তৈরি করতে পারে।



