বাঙালি সাহিত্য জগতের বিশিষ্ট লেখক মণি শঙ্কর মুখার্জি, যাকে পাঠকরা সহজে শঙ্কর নামে চেনে, ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিকালের দিকে কলকাতা শহরের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করা শঙ্কর ৯২ বছর বয়সে এই পৃথিবী ত্যাগ করেন। তার দীর্ঘায়ু জীবন এবং সাহিত্যিক কর্মকর্মে বাঙালির সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর গভীর বিশ্লেষণ দেখা যায়, যা আজও পাঠকদের মধ্যে আলোচনার বিষয়।
শঙ্করের শৈশবকাল ছিল আর্থিক সংকটে ভরা; কিশোর বয়সে পিতার মৃত্যুর ফলে তাকে দ্রুতই পরিবারের প্রধানের ভূমিকা নিতে হয়। জীবনের এই কঠিন পর্যায়ে তিনি ব্রিটিশ আইনজীবীর সহকারী হিসেবে কাজ করেন, টাইপরাইটার পরিষ্কার করেন, ছাত্রদের টিউশন দেন এবং সাময়িকভাবে পণ্য বিক্রি করে গৃহস্থালির খরচ মেটাতেন। এই বহুমুখী অভিজ্ঞতা তাকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের বাস্তবতা দেখার সুযোগ দেয় এবং পরবর্তীতে তার লেখায় তা প্রতিফলিত হয়।
শঙ্করের প্রথম উপন্যাস “কতো অজানারে” তার কর্মজীবনের প্রারম্ভিক সময়ে প্রকাশিত হয়। এই রচনায় তিনি তার প্রাক্তন নিয়োগকর্তার প্রতি সম্মান ও ক্ষতির অনুভূতি তুলে ধরেছেন, যা তার পরবর্তী কাজের জন্য ভিত্তি স্থাপন করে। ১৯৭০-এর দশকে তিনি “জানা আরণ্য” নামের উপন্যাসটি রচনা করেন, যা তার নাতি-নাতনিরা তার দাদীর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার থেকে খুঁজে পায়। যদিও শিশুকালীন পাঠকরা এই রচনাটি পুরোপুরি বুঝতে পারেননি, তবু তা তাদের উপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং সাহিত্যকে কেবল গল্প নয়, সমাজের গঠন বিশ্লেষণের মাধ্যম হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।
বছরের পর বছর শঙ্কর উপন্যাস, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী এবং ভ্রমণলেখা সহ বিভিন্ন ধরণের রচনা রচনা করে বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে বিশেষ স্থান অর্জন করেন। তার রচনায় কলকাতা, পুরনো ক্যালকাটা নামেও পরিচিত, শহরের জীবন্ত চিত্র ও সামাজিক বৈষম্যের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ দেখা যায়। তিনি আধুনিক বাঙালির নৈতিক বিচ্ছিন্নতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, হতাশা এবং গর্বের বিষয়গুলোকে সাহিত্যের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, তবে উত্তর না দিয়ে পাঠকের নিজস্ব চিন্তায় ছেড়ে দেন।
শঙ্করের লেখনীতে প্রায়শই নগর জীবনের গোপন কাঠামো, শ্রেণীভেদ এবং গর্বের ভঙ্গুরতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি সমাজের শক্তিশালী ও দুর্বল উভয় দিক থেকে পর্যবেক্ষণ করে একটি অনন্য দৃষ্টিকোণ গড়ে তোলেন, যা তাকে বাঙালি সাহিত্যিকদের মধ্যে আলাদা করে তুলেছে। তার কাজের মাধ্যমে পাঠকরা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত চরিত্রের নয়, বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটেরও বিশ্লেষণ করতে শিখেছেন।
মৃত্যুর পূর্বে শঙ্কর কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালের গৃহশয্যায় ছিলেন। তার অবস্থা গুরুতর ছিল এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেষ মুহূর্তগুলো কাটিয়েছেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স ৯২ বছর, যা তার দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ জীবনের প্রতীক। তার পরিবার ও সাহিত্য সমিতি শোক প্রকাশ করে এবং তার অবদানকে স্মরণ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও স্মারক রচনা করার পরিকল্পনা করেছে।
শঙ্করের মৃত্যুর পর বাঙালি সাহিত্যিক ও পাঠকগণ তার কাজের পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেছে। তার রচনাগুলো এখনো প্রকাশনা ঘরে নতুন পাঠককে আকর্ষণ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তার লেখার মাধ্যমে সমাজের গোপন সমস্যাগুলোকে আলোকিত করার ক্ষমতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লেখকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
শঙ্করের জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্তসার দেখায় যে তিনি কেবল একজন গল্পকারই নয়, বরং সমাজের নৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণের এক বিশিষ্ট পর্যবেক্ষক ছিলেন। তার সাহিত্যিক উত্তরাধিকার বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং তার রচনাগুলো পাঠকের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলতে থাকবে।
শঙ্করের মৃত্যু বাঙালি সাহিত্য জগতে এক বড় ক্ষতি, তবে তার রচনা ও চিন্তাধারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ রূপে রয়ে যাবে। তার স্মৃতি ও কাজের মাধ্যমে বাঙালি সমাজের আত্মবিশ্লেষণ অব্যাহত থাকবে, যা তার জীবনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল।



