ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম ৮৯ বছর বয়সে ক্যালিফোর্নিয়ার সেক্রামান্টো শহরে মারা গেছেন। তার মৃত্যুর সংবাদ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত হয় এবং বাংলাদেশ সরকার শোক প্রকাশ করে। মাইলাম ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল।
উইলিয়াম বি মাইলাম ১৯৬২ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে যোগ দেন এবং তার ক্যারিয়ার জুড়ে এশিয়া, ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকায় বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৯০ সালে তিনি ঢাকা মিশনে আসেন, যখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তনের প্রান্তে ছিল। তার আগমন সময়ে মার্কিন সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক সংস্কারের সমর্থন বাড়াতে চেয়েছিল, এবং মাইলামের কূটনৈতিক দক্ষতা এই নীতির বাস্তবায়নে সহায়তা করে।
মাইলামের দুবছরের মেয়াদে মার্কিন-বাংলাদেশ সম্পর্কের বেশ কয়েকটি মূল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মধ্যে বাণিজ্যিক শুল্ক হ্রাস, উন্নয়ন সহায়তা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত। তিনি দু’দেশের কূটনৈতিক সংলাপকে ঘনিষ্ঠ করে তোলার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের অবকাঠামো প্রকল্পে মার্কিন তহবিলের প্রবাহ ত্বরান্বিত করেন। এই সময়ে বাংলাদেশ সরকার তার অর্থনৈতিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সমর্থন চেয়েছিল, এবং মাইলামের নেতৃত্বে মার্কিন সরকার এই চাহিদা মেটাতে সহায়তা করে।
১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার পর চালু হওয়া ‘অপারেশন সি অ্যাঞ্জেল’ প্রকল্পে মাইলামের সরাসরি অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। এই মানবিক উদ্যোগে মার্কিন সরকার ত্বরিত ত্রাণ সামগ্রী ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে, যা বন্যা-প্রবণ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়। মাইলাম এই মিশনে কূটনৈতিক সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন, ফলে ত্রাণ কার্যক্রম দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়। তার এই অবদানকে বাংলাদেশ সরকার শোকবার্তায় বিশেষভাবে উল্লেখ করে।
দূতাবাসে দায়িত্ব শেষ করার পর মাইলাম যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ত্রৈমাসিক সাময়িকী “সাউথ এশিয়া পার্সপেকটিভস”-এর সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন এবং “রাইট টু ফ্রিডম” সংস্থার প্রেসিডেন্ট হিসেবে মানবাধিকার বিষয়ক প্রচার চালান। পাশাপাশি তিনি ওয়াশিংটন ভিত্তিক উইলসন সেন্টারের সিনিয়র স্কলার হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নীতি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান। অবসর জীবনে তিনি প্রায়ই বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে মন্তব্য করে থাকেন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাইলামের মৃত্যুর শোক প্রকাশ করে এবং তার কূটনৈতিক ক্যারিয়ারকে “দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও বাংলাদেশের সমসাময়িক বিষয়ের গভীর জ্ঞান” হিসেবে প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে মাইলাম ১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে যোগ দিয়ে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত ছিলেন এবং তার নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। মাইলামের পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে শোকবার্তায় তিনি তার আত্মার মাগফিরাতের প্রার্থনা করেন।
মাইলামের মৃত্যু আন্তর্জাতিক কূটনীতিক সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার কর্মজীবন সময়ে মার্কিন সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় গণতান্ত্রিক শাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল, এবং মাইলাম এই নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে মার্কিন সরকার দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করতে নতুন কৌশল প্রণয়ন করছে, যেখানে বাংলাদেশকে প্রধান অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। মাইলামের কূটনৈতিক নীতি ও মানবিক উদ্যোগের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে এই কৌশলগুলোর ভিত্তি হতে পারে।
মাইলামের অবসর পরবর্তী কাজগুলোও দক্ষিণ এশিয়ার নীতিনির্ধারকদের জন্য রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে। তার প্রকাশিত প্রবন্ধগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু পরিবর্তন, বাণিজ্যিক সংহতি এবং মানবাধিকার বিষয়ক বিশ্লেষণ বর্তমান নীতি গঠনে প্রভাব ফেলছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সরকার এবং মার্কিন সরকার যৌথভাবে নতুন বাণিজ্যিক চুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা করছে, যা মাইলামের সময়ে গড়ে তোলা ভিত্তির উপর ভিত্তি করে আরও দৃঢ় হবে। তার মৃত্যু সত্ত্বেও, তার কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক দায়িত্ববোধ দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



