ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় বাস করা যমজ সন্তানহীন দম্পতি, যাত্রাবাড়ীর অটোরিকশা ব্যবসা চালান, ২৬ ডিসেম্বর একটি ক্লিনিকে তাদের পুত্রের জন্ম দেন। শিশুর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে পরের দিনই তাকে ডেলটা হেলথকেয়ারের নিউবর্ন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়। দুই দিন পর, হাসপাতাল পরিবারকে মৃত শিশুর দেহ হস্তান্তর করে।
বাবার শারীরিক জটিলতা থাকায় ডাক্তাররা পূর্বেই জানিয়ে দেন, শিশুকে নিকট ভবিষ্যতে আইসিইউতে রাখা লাগতে পারে। মা জানিয়ে বলেন, ওষুধের কারণে শিশুকে স্তন্যপান দেওয়া সম্ভব হয়নি এবং যখন ডাক্তাররা স্তন্যপান শুরু করার কথা জানান, তখনই শিশুর অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। শিশুকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় এবং মা তার পাশে থাকতে পারেন না। জন্মের পর শিশুর নাভি ক্লিপ দিয়ে বন্ধ করা হয়েছিল।
বাবার স্বামী, মো. শাহিন, ২৯ ডিসেম্বর ডেলটা হেলথকেয়ার থেকে ফোনে জানেন যে শিশুর ফুসফুসে রক্তক্ষরণ হয়েছে, রক্ত সঞ্চালন বন্ধ, এবং তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। রক্তদাতা দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায়, তবে তার পর কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয় না এবং রাতের শেষের দিকে শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
মৃত শিশুর হস্তান্তরের পর দম্পতি সন্দেহ করেন যে হস্তান্তর করা শিশুটি তাদের সন্তান নয়। শ্যামপুর থানায় অভিযোগ দাখিলের পর, তারা ডেলটা হেলথকেয়ারের সিসিটিভি ফুটেজের দাবি করেন। হাসপাতাল প্রথমে ফুটেজ দিতে অস্বীকার করে, তবে আইনি হুমকির পর তা সরবরাহ করে। ফুটেজে দেখা যায়, ২৮ ডিসেম্বর রাত ১০ঃ৫৭ টায় নির্ধারিত শিশুর বিছানায় কোনো শিশু নেই; ১১ঃ৩৬ টায় অন্য একটি নবজাতক সেই বিছানায় প্রবেশ করে। পরের দিনই সেই নবজাতককে মৃত অবস্থায় পরিবারকে হস্তান্তর করা হয়।
শাহিন ক্লিনিকেও তদন্ত করেন যেখানে শিশুটি জন্ম নেয়। প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তিনি ঢাকার আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় ডেলটা হেলথকেয়ারের এনআইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. মুজিবর রহমান, হাসপাতালের ব্যবস্থাপক এবং মোট দশজনকে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে প্রমাণ গোপন করা, প্রতারণা এবং শিশুর বদলি অন্তর্ভুক্ত।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি, পরিবারের দাবি যাচাইয়ের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল শিশুর পরিচয় নিশ্চিত করবে এবং মামলার প্রমাণভিত্তিক দিককে শক্তিশালী করবে। বর্তমানে আদালত মামলাটি শোনার জন্য তারিখ নির্ধারণ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে অতিরিক্ত তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছে।
এই ঘটনার পর, ডেলটা হেলথকেয়ারের পরিচালনা পরিষদ রোগীর নিরাপত্তা ও নৈতিক মানদণ্ডের পুনর্বিবেচনা করার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছে। তবে দম্পতি এবং সংশ্লিষ্ট পরিবার এখনও শোকাহত, এবং তারা দাবি করছেন যে শিশুর বদলির ঘটনা সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত হওয়া উচিত।
মামলার পরবর্তী ধাপগুলোতে ডিএনএ ফলাফলের অপেক্ষা, আদালতের রায় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই প্রক্রিয়ায় শিশুর পরিচয়, হস্তান্তরের সময়ের নথিপত্র এবং হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ প্রোটোকল পরীক্ষা করা হবে। শেষ পর্যন্ত, আইনি ব্যবস্থা ও নৈতিক দায়িত্বের দিক থেকে এই ঘটনা কীভাবে সমাধান হবে তা দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও রোগীর অধিকার রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়াবে।



