দেবপ্রিয়া ভট্টাচার্য, সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি, বাংলাদেশের সমবেতের প্রধান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাকি সময়ে কঠোর বাজেট সীমা আরোপের সঙ্গে একটি আর্থিক স্থিতিশীলতা পরিকল্পনা চালু করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এই বক্তব্য ব্র্যাক ইন সেন্টার, ঢাকা-তে অনুষ্ঠিত “নতুন সরকারের সূচনায় অর্থনৈতিক পর্যালোচনা” শিরোনামের মিডিয়া ব্রিফিং-এ উপস্থাপন করেন।
ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, বর্তমান আর্থিক অবস্থান সংকীর্ণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশ দুর্বল হওয়ায় সরকারকে বাস্তবসম্মতভাবে বর্তমান বাজেটের পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কঠোর বাজেট সীমা মানে সরকার আর্থিক ঘাটতি বা ক্ষতির মুখে থাকা কোনো সংস্থাকে আর্থিক সাহায্য প্রদান করবে না; সংস্থাগুলোকে তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বের ওপর নির্ভর করতে হবে এবং প্রয়োজনে কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ব্রিফিংয়ে তিনি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে সামগ্রিক গঠন টেকসই থাকবে না, এ কথাটিকে পুনর্ব্যক্ত করেন। “ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা সব সংস্কারের মাতা,” তিনি উল্লেখ করে চারটি মূল সূচককে স্থিতিশীলতার মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরেন: মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার, মুদ্রার বিনিময় হার এবং দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের অবস্থা।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়, ফলে ভোক্তা ব্যয় কমে এবং ব্যবসার আয় হ্রাস পায়। সুদের হার যদি বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রাখে, তবে বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট হয় এবং নতুন প্রকল্পের অর্থায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। মুদ্রার বিনিময় হার অস্থির থাকলে রপ্তানি ও আমদানি উভয় ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বাড়ে, যা বাণিজ্যিক চুক্তি ও মূল্য নির্ধারণে বাধা সৃষ্টি করে। ঋণের বোঝা যদি টেকসই না হয়, তবে দেশের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে যায়।
এই চারটি সূচকের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যকর করা সম্ভব নয়, তিনি জোর দেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, স্থিতিশীলতা না থাকলে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবাহ কমে যাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা আসবে, বিদেশি মূলধন আকর্ষণ কঠিন হবে এবং বহিরাগত ঋণ পরিশোধে সমস্যার সৃষ্টি হবে। শেষ পর্যন্ত, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান সরকার, যা ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করেছে, তার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হল দুর্বল ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা, বেসরকারি বিনিয়োগের হ্রাস, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সীমিত আর্থিক স্থান। এই সমস্যাগুলো সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে।
তিনি সরকারকে আহ্বান জানান, আর্থিক নীতি নির্ধারণে বাস্তবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে বাজেটের পুনর্গঠন করা উচিত, যাতে ব্যয় ও আয়ের মধ্যে সমতা রক্ষা করা যায়। কঠোর বাজেট সীমা আরোপের মাধ্যমে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা যাবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমে যাবে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হলে বেসরকারি খাতের আস্থা বাড়বে, ফলে নতুন প্রকল্প ও শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। এটি সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে এবং দেশের মোট উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ও ঋণ সংগ্রহে সুবিধা দেবে।
ভট্টাচার্য শেষ করেন, যদি সরকার এই সুপারিশগুলোকে বাস্তবায়ন করে, তবে দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে উঠবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ম্যাক্রোইকোনমিক সূচকগুলোর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং কঠোর বাজেট শাসনই দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি।



