রোজা মাসের প্রথম দিন চট্টগ্রামের প্রধান কাঁচা বাজার রেয়াজুদ্দিনে ক্রেতাদের বিশাল ভিড় দেখা গেল। ইফতারের প্রস্তুতির জন্য তাড়াতাড়ি কেনাকাটা করা লোকজনের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল। তবে সবজির দাম প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষের স্রোত দেখা দিল।
বিক্রেতারা দাবি করছেন, রোজার মাসে চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু সরবরাহ যথেষ্ট না হওয়ায় দাম স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে, ক্রেতারা অভিযোগ করছেন যে বিক্রেতারা রোজার সুযোগ নিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন। উভয় পক্ষের এই মতবিরোধ বাজারের তাপমাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে।
রেয়াজুদ্দিন বাজারে টমেটোর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভালো মানের টমেটো এখন প্রতি কেজিতে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, আর ছোট আকারের টমেটো ৫০ থেকে ৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। দুই দিন আগে একই ধরনের টমেটো প্রায় ৪০ টাকায় পাওয়া যেত, ফলে দাম বৃদ্ধি ১৫-৩০ শতাংশের কাছাকাছি।
অন্যান্য সবজির দিকেও একই প্রবণতা দেখা যায়। কাকু (খিরা) ও ছোট শসা প্রত্যেক কেজিতে ১০০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১৬০ টাকা, ধনে পাতা ৬০ টাকা, ফুলকপি ৪৫‑৫০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ টাকা, বেগুন ৬০‑৭০ টাকা, ঢেঁড়শ ১২০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, গাজর ৬০ টাকা, লাউ ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০‑৫০ টাকা, মুলা ৩০ টাকা এবং বড় শসা ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এই সবজির দাম দুই দিন আগে তুলনায় ৫ থেকে ১৫ টাকা বেশি।
লেবুর দিকেও দাম বৃদ্ধি স্পষ্ট। বড় আকারের লেবু একটিতে ৪০ টাকা, আর এক ডজন লেবু কিনলে মোট ২০০ টাকা দিতে হয়। শরবত তৈরির জন্য লেবু অপরিহার্য, ফলে রোজার ইফতার সময়ে এর চাহিদা তীব্র। পুদিনা পাতার দামও বেড়ে ১১০ টাকা প্রতি কেজি, আর এক গুচ্ছের দাম কয়েক টাকায় সীমাবদ্ধ।
বিক্রেতা আহমদ জানান, শীতকালে সবজি সাধারণত সস্তা থাকে, তবে এই বছর চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বৃদ্ধি স্বাভাবিক। তিনি যোগ করেন, “আমরা আড়ত থেকে কেনা পণ্য বিক্রি করি; আড়তে দাম বেশি হলে আমাদের বিক্রয়মূল্যও ততই বাড়ে।” এই মন্তব্য থেকে দেখা যায়, হোলসেল বাজারের দাম সরাসরি রিটেল দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
রেয়াজুদ্দিন বাজারের দাম চট্টগ্রামের অন্যান্য বাজারের তুলনায় কিছুটা কম। মোমিন রোড, আন্দরকিল্লা ও বক্সিরহাটের ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের কাছ থেকে একই সবজি প্রতি কেজিতে ৫‑১০ টাকা বেশি দামে পাওয়া যায়। এই পার্থক্য স্থানীয় সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্য ও পরিবহন খরচের পার্থক্যকে নির্দেশ করে।
ব্রয়লার মুরগির দিকেও দাম বৃদ্ধি দেখা গেছে। রোজার প্রথম দিনে মুরগির দাম পূর্বের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী, যা ইফতার খাবারের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মুরগি ও সবজির সমন্বিত দাম বৃদ্ধি ভোক্তাদের গৃহস্থালির ব্যয়কে প্রভাবিত করবে।
বাজারের এই মূল্যবৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি সূচকে অবদান রাখবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন। রোজার মাসে খাবারের চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, ফলে সরবরাহ‑চাহিদার অমিল দ্রুত দামকে ত্বরান্বিত করে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের গৃহস্থালির জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সরবরাহ শৃঙ্খলের ঘাটতি ও মৌসুমী চাহিদা দুটোই একসাথে কাজ করলে দাম স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়। হোলসেল বাজারে দাম বৃদ্ধি হলে রিটেল বিক্রেতারা বিক্রয়মূল্য বাড়াতে বাধ্য হয়, যা শেষ পর্যন্ত শেষ গ্রাহকের কাছে পৌঁছে। এই চক্র ভোক্তা আস্থা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করে।
ভবিষ্যতে দাম কীভাবে চলবে তা নির্ভর করবে সরবরাহের পরিমাণ ও রোজার পরবর্তী সপ্তাহে চাহিদার পরিবর্তনের ওপর। যদি সরবরাহ পুনরায় স্থিতিশীল হয় এবং বিক্রেতারা অতিরিক্ত মুনাফা না নেওয়ার নীতি মেনে চলে, তবে দাম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক স্তরে ফিরে আসতে পারে। তবে রোজার শেষের দিকে চাহিদা হ্রাস না পেলে, দাম উচ্চ স্তরে স্থায়ী হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, রোজার প্রথম দিনে চট্টগ্রামের কাঁচা বাজারে সবজি ও মুরগির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সরবরাহ‑চাহিদার অমিল এবং রোজার বিশেষ চাহিদার ফল। এই প্রবণতা ভোক্তাদের ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং বাজারের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে, তাই বিক্রেতা ও নীতিনির্ধারকদের জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করা এবং মূল্য নীতি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।



