ঢাকা, ২০ ফেব্রুয়ারি – সরকার গঠনের পরপরই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বেসরকারি বিনিয়োগের উত্থান এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কাঠামোগত সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিটিজেন প্ল্যাটফর্ম, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) বাস্তবায়নে কাজ করে, এই বিষয়গুলোকে নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছে।
সংস্থার মতে, ভঙ্গুর সামষ্টিক স্থিতিশীলতা, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবাহ এবং সংকুচিত রাজস্ব সক্ষমতা একসাথে সমাধান না করা পর্যন্ত অর্থনীতিকে স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। তাই দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
গতকাল ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু : অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক একটি মিডিয়া ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। এই সেশনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন সিপিডি এর সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং সিটিজেন প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। উভয়েই দেশের আর্থিক নীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
ড. ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গৃহীত ক্রয় ও বৈদেশিক চুক্তিগুলোর স্বচ্ছতা যাচাই করা জরুরি। তিনি বলেন, এই চুক্তিগুলো শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র বা বন্দর-সম্পর্কিত নয়, বরং বিভিন্ন সেক্টরে বিস্তৃত, যার অনেক তথ্য এখনো পরিষ্কার হয়নি। তাই একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
অধিকন্তু, তিনি নতুন সরকারকে একটি উত্তরণকালীন দল গঠনের পরামর্শ দেন। এই দলের কাজ হবে আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ময়নাতদন্ত করে একটি সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং ডকুমেন্ট প্রস্তুত করা। এই ডকুমেন্টের ভিত্তিতে সরকার প্রয়োজনীয় নীতি পরিবর্তন ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।
ড. ভট্টাচার্য আরও জোর দিয়ে বলেন, আগামী মার্চের শেষ নাগাদ জাতীয় সংসদে একটি আর্থিক বিবৃতি উপস্থাপন করা উচিত। ২০০৯ সালের সরকারি আয়‑ব্যয় ও বাজেট ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ অনুসারে, এমন একটি বিবৃতি সরকারের আর্থিক স্বচ্ছতার মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।
কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করার আহ্বান জানান। ১৮০ দিনের পরিকল্পনা ত্বরান্বিত না করে, চলতি অর্থবছরে সংযম বজায় রাখা এবং পরবর্তী অর্থবছরের জন্য সুসংগঠিত প্রস্তুতি নেওয়া অধিক ফলপ্রসূ হবে। এই পদ্ধতি মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য আর্থিক সংকট মোকাবেলায় সহায়তা করবে।
অতিরিক্তভাবে, তিনি নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন সিন্দিকেট ভাঙার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবিও করেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজারে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
তৌফিকুল ইসলাম খান উল্লেখ করেন, যদিও বৈশ্বিক পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি সামান্য হ্রাস পেয়েছে, তবু বাংলাদেশে তা এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি জানুয়ারি মাসের ১২ মাসের গড় মূল্যসূচক উল্লেখ করে দেশের মুদ্রা ও পণ্যের দামের প্রবণতা সম্পর্কে সতর্কতা জানান।
কিন্তু তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক পণ্যের মূল্যের ওঠানামা প্রধান কারণ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কাঠামোগত সংস্কার ত্বরান্বিত করা জরুরি।
সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরকারকে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে কর কাঠামোর পুনর্গঠন, ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স বাড়ানো এবং অবকাঠামো প্রকল্পে বেসরকারি অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে, সিটিজেন প্ল্যাটফর্মের মতামত হলো, নতুন সরকার যদি স্বল্পমেয়াদী আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সংস্কারে অগ্রসর হয়, তবে মূল্যস্ফীতি দমন, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে। এই দিকগুলোকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হবে।



