ইউটারা, ৯ ফেব্রুয়ারি – ৩২ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি নারী, যাকে রিমা নামে পরিচিত করা হয়েছে, ইদ-উল-আজহা ছুটির আগে সৌদিতে কর্মসংস্থান পাওয়ার আশায় গিয়ে শোষণ, ধর্ষণ এবং জেলবন্দি সহ একাধিক অপরাধের শিকার হয়েছেন। তিনি বর্তমানে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের আশকোনা হাজ ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন।
রিমা জানান, তিনি ঢাকা শহরের একটি স্থানীয় ব্রোকারের মাধ্যমে সৌদিতে একটি কোম্পানির চাকরির প্রতিশ্রুতি পেয়ে ভিসা পেয়েছিলেন। চাকরির বেতন মাসে ১,০০০ রিয়াল, খাবার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা থাকবে বলে তাকে আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তিনি এবং দুইজন সঙ্গীকে তিন দিন কোনো খাবার ছাড়াই একটি অফিসে আটকে রাখা হয়। পরে তাদেরকে একটি গৃহস্থালিতে পাঠানো হয়, যেখানে খাবার সীমিত এবং কাজের সময় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
রিমা উল্লেখ করেন, গৃহস্থালির মালিকের ফ্রিজে তালা লাগিয়ে রাখা হয়, এমনকি চালও লক করা থাকে। তিনি একদিনে এক টুকরো রুটি ও একটি ডিমই পান। যখন তিনি কাজের শর্ত নিয়ে অফিসে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন, তখন তাকে জানানো হয় যে তার জন্য ১০,০০০ রিয়াল অর্থ প্রদান করা হয়েছে এবং তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
কয়েক মাসের কঠোর শোষণের পর রিমা মদিনায় পালিয়ে যান এবং পরে মক্কায় গিয়ে পুলিশে আত্মসমর্পণ করার চেষ্টা করেন। তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আটক হন, তবে দ্রুত ছাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি আবার একটি বাংলাদেশি মহিলার কাছ থেকে কাজের প্রতিশ্রুতি পেয়ে মক্কায় পৌঁছান, তবে সেখানে তাকে বেতন না দিয়ে যৌন ব্যবসায় জোর করে ধরা হয়।
রিমা জানান, তিনি যৌন ব্যবসা থেকে সরে আসতে চাইলেন এবং অর্থ দাবি করলে তাকে একটি ঘরে আটকে ধরা হয়, শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হন। তিনি আরও জানান, তার নিয়োগকর্তার সঙ্গে যুক্ত একটি চালকও তাকে ধর্ষণ করে এবং পরে তাকে পুলিশে হস্তান্তর করে।
অবশেষে রিমা তার নিয়োগকর্তার দ্বারা চুরির অভিযোগে পাঁচ মাসের জন্য জেলে বসে। জেলখানায় তাকে শারীরিক হিংসা, বৈদ্যুতিক শক এবং অন্যান্য নির্যাতনের শিকার করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
রিমা বর্তমানে গর্ভবতী, গর্ভের ছয় মাসে পৌঁছেছেন এবং তার স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিচ্ছেন। তিনি বিমানবন্দরের কর্মীদের সাহায্যে দেশে ফিরে আসেন এবং এখন আশকোনা হাজ ক্যাম্পের ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের শিখন কেন্দ্রের আশ্রয়ে আছেন।
রিমার ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ ইতিমধ্যে অভিযোগ দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে। গৃহস্থালির মালিক, চালক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শোষণ, ধর্ষণ, মানব পাচার এবং জেলবন্দি সংক্রান্ত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের তারিখ সম্পর্কে তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি।
এই ধরনের শ্রমিক শোষণ ও মানব পাচার মামলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি পুনরায় নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। রিমার মত শিকারদের সুরক্ষার জন্য যথাযথ আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসন প্রোগ্রাম চালু করার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
রিমা উল্লেখ করেন, তিনি বিদেশে কাজের জন্য গিয়েছিলেন অর্থের জন্য নয়, কোনো ঋণ পরিশোধের জন্য নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট চাকরি পেতে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি কাজ না দেওয়া হয় তবে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো উচিত ছিল, আর তার জীবনকে এভাবে ধ্বংস করা কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নয়।
এই ঘটনা শ্রমিক সুরক্ষা, মানব পাচার এবং আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের প্রয়োগের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপের মাধ্যমে শিকারদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধ করা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



