গাজা উপত্যকায় দক্ষিণে প্রায় ৩৫০ একর জমিতে মার্কিন সরকার পরিচালিত একটি বিশাল সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশিত নথি প্রকাশের ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই নথি যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের হাতে পড়ে এবং গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে গঠিত “বোর্ড অব পিস”ের গোপন প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে ঘাঁটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর (আইএসএফ) প্রধান অপারেশনাল সেন্টার হিসেবে কাজ করবে এবং প্রায় পাঁচ হাজার সৈন্যের জন্য আবাসিক ও প্রশিক্ষণ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
প্রায় ৩৫০ একর বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্মাণ কাজটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে এবং পুরো পরিসরটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা থাকবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার স্থাপন করা হবে, যা ঘাঁটির চারপাশে সর্বদা পর্যবেক্ষণ বজায় রাখবে। ঘাঁটির অভ্যন্তরে ছোট অস্ত্র প্রশিক্ষণ রেঞ্জ, সামরিক সরঞ্জামের গুদাম এবং উন্নত বায়ু চলাচল সুবিধাযুক্ত বিশেষ বাঙ্কার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্মাণকারী সংস্থাগুলিকে মাটির নিচে হামাসের সুড়ঙ্গ শনাক্ত করার জন্য বিশেষ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই জরিপের মাধ্যমে সুড়ঙ্গের অবস্থান নির্ণয় করে সেগুলিকে নিষ্ক্রিয় করা অথবা নিরাপদে অতিক্রম করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি মাটি পরীক্ষার সময় মানবদেহের অবশেষ পাওয়া যায়, তবে তা সনাক্ত করার জন্য নির্দিষ্ট প্রোটোকল অনুসরণ করতে হবে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত “বোর্ড অব পিস”ের প্রথম বৈঠকে মার্কিন সরকার ১০ বিলিয়ন ডলার অনুদান ঘোষণা করেছে, যা গাজা অঞ্চলের পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তার জন্য বরাদ্দ করা হবে। একই বৈঠকে ইন্দোনেশিয়া ৮,০০০ সৈন্য পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে এবং কাতার ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এই বৈঠকে ফিলিস্তিনিদের কোনো প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেনি এবং ইউরোপের প্রধান দেশগুলোও উপস্থিত ছিলেন না।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, “বোর্ড অব পিস” মূলত একটি আইনি কাঠামো হিসেবে কাজ করছে, যার মাধ্যমে মার্কিন সরকার গাজায় তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কাঠামো ব্যবহার করে মার্কিন সরকার গাজায় দীর্ঘমেয়াদী সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, যা অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিবিধিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
গাজায় ঘাঁটি নির্মাণের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে মাটির নিচে হামাসের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক এবং ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়া হাজার হাজার মৃতদেহ উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে নির্মাণকারী সংস্থাগুলিকে মাটি পরীক্ষার সময় সুড়ঙ্গ সনাক্তকরণ এবং মানবদেহের অবশেষ পাওয়া গেলে বিশেষ প্রোটোকল অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই প্রোটোকল অনুযায়ী, মৃতদেহের সনাক্তকরণে আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ড মেনে চলা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা গাজায় এমন বৃহৎ সামরিক স্থাপনা নির্মাণকে ‘দখলদারিত্ব’ হিসেবে বিবেচনা করছেন, বিশেষ করে যখন স্থানীয় অনুমতি ছাড়া কাজটি চালিয়ে যাওয়া হয়। গাজার বর্তমান নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে থাকলেও, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সমন্বয় প্রক্রিয়া এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
মার্কিন সরকার গাজায় এই ঘাঁটি গড়ে তোলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে গাজা উপত্যকায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়, তবে এই উদ্যোগের ফলে অঞ্চলের বিদ্যমান উত্তেজনা বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে ঘাঁটির সম্পূর্ণ নির্মাণ শেষ হলে, সেখানে উপস্থিত ৫,০০০ সৈন্যের মাধ্যমে মার্কিন সরকার গাজা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা ও শাসন ব্যবস্থার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
এই প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, নির্মাণ কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল গঠন করার সম্ভাবনা উত্থাপিত হয়েছে। একই সঙ্গে, গাজা অঞ্চলের মানবিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা ও তহবিলের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, গাজায় ৩৫০ একর জমিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে নতুন এক মোড়ের সূচনা করতে পারে, যা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ গঠন ও শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।



