গাজা উপত্যকায় স্থায়ী শান্তি গড়ার লক্ষ্যে গঠিত শান্তি পরিষদের প্রথম বৈঠক ১৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় মার্কিন সরকার ১০ বিলিয়ন ডলার অনুদান ঘোষণা করে এবং একই সময়ে গার্ডিয়ান প্রকাশিত নথিতে গাজায় ৩৫০ একর আয়তনের সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশ পায়।
নথিতে উল্লেখ আছে যে, ভবিষ্যতে গঠিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) এই ঘাঁটিকে অপারেশনাল বেস হিসেবে ব্যবহার করবে এবং প্রায় ৫,০০০ সৈন্যের জন্য সুবিধা প্রদান করবে। ঘাঁটির নির্মাণ ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে এবং এটি গাজার দক্ষিণে অবস্থিত শুষ্ক সমতল ভূমিতে স্থাপন করা হবে।
নথির এক অংশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঘাঁটির নিচে ভূগর্ভস্থ ফাঁকা স্থান ও সুড়ঙ্গের অনুসন্ধানের জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গার্ডিয়ান অনুসারে, এই সুড়ঙ্গগুলো গাজার বিস্তৃত হামাসের নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
নির্মাণ কাজের সময় মানবদেহাবশেষ বা ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করার প্রোটোকলও নথিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গাজার সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ধ্বংসাবশেষের নিচে প্রায় দশ হাজার ফিলিস্তিনি মৃতদেহ চাপা রয়েছে, যা কাজের নিরাপত্তা ও নৈতিক দিক থেকে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।
ঘাঁটির জন্য নির্ধারিত জমির মালিকানা স্পষ্ট নয়, তবে গাজার দক্ষিণের বড় অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী ডায়ানা বুত্ত গার্ডিয়ানকে জানিয়ে বলেন, ফিলিস্তিনি সরকারের অনুমতি ছাড়া তাদের ভূখণ্ডে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ দখলদারিত্বের শামিল।
কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান যে, মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বেশিরভাগ যোগাযোগ এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে হয়, সরকারি ইমেইল ব্যবহার করা হয় না। এই পদ্ধতি নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় রাখতে নেওয়া হয়েছে বলে অনুমান করা যায়।
মার্কিন সরকার থেকে এই প্রকল্পের অনুমোদন সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান, তবে গার্ডিয়ানকে জানান যে, মার্কিন সেনা গাজায় উপস্থিতি বজায় রাখবে। এই তথ্যটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
হামাসের প্রতিনিধিরা নথিতে উল্লিখিত সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের উল্লেখকে গাজা অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই ধরনের সামরিক উদ্যোগের বিরোধিতা করতে আহ্বান জানায়। তারা যুক্তি দেন যে, শান্তি পরিষদের অধীনে গৃহীত কোনো পদক্ষেপই গাজা জনগণের স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ন করবে।
ফিলিস্তিনি সরকারও গার্ডিয়ানকে জানিয়ে জানান যে, গাজায় কোনো বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের জন্য তাদের স্পষ্ট অনুমোদন নেই এবং এই ধরনের কাজ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। তারা যুক্তি দেন যে, গাজা অঞ্চলের পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার কেবলমাত্র ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে হওয়া উচিত।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে গাজার দক্ষিণে বৃহৎ ভূমি ইতিমধ্যে তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তারা গার্ডিয়ানকে জানিয়েছে যে, গাজায় কোনো বিদেশি সামরিক উপস্থিতি তাদের নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হতে পারে। তবে তারা সরাসরি গার্ডিয়ানকে কোনো মন্তব্যের জন্য আহ্বান জানায়নি।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, শান্তি পরিষদের অধীনে গৃহীত এই সামরিক পরিকল্পনা গাজা অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিবিধি পরিবর্তন করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে, এটি মার্কিন সরকারের গাজা পুনর্গঠন নীতির বাস্তবায়নকে জটিল করে তুলতে পারে।
ভবিষ্যতে গাজায় সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্যে কীভাবে মূল্যায়িত হবে, তা গাজা-ইসরায়েল সম্পর্ক, মার্কিন-ফিলিস্তিনি সংলাপ এবং শান্তি পরিষদের কার্যকারিতার ওপর নির্ভরশীল হবে। এই বিষয়গুলো পরবর্তী বৈঠক ও আলোচনার মূল বিষয় হিসেবে উঠে আসবে।
গার্ডিয়ান প্রকাশিত নথি গাজা অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সম্ভাবনা ও তার ফলে শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। গাজা জনগণ, ফিলিস্তিনি সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এখন এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও তার পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্টতা দাবি করছে।



