প্রতুল মুখোপাধ্যায়, বাংলা গানের স্বর ও সামাজিক চেতনার প্রতীক, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে হাসপাতালে শেষ শ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর পূর্বে কয়েক দিনই তিনি হাসপাতালের শোয়ায় বসে “আমি বাংলায় গান গাই” শ্লোকগুলো গাইছিলেন, যা উপস্থিতদের কাছে গভীর ছাপ রেখে গিয়েছে।
মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৪২ সালে বরিশালে; তিনি পার্টিশনের সময়ের বিশৃঙ্খলা, স্থানান্তরের কষ্ট এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা পরবর্তীতে তার সঙ্গীতের মূল থিম হয়ে ওঠে।
গণনাট্য ও গানসংগীতের ঐতিহ্যে গানের দলীয় সুরের ওপর জোর দেওয়া হয়, তবে মুখোপাধ্যায় একা গাইবার পদ্ধতি বেছে নেন। তিনি স্টেজে যন্ত্রপাতি না নিয়ে, কণ্ঠস্বরকে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতেন, যা তার গানের স্বতন্ত্র স্বরকে তুলে ধরত। তার কণ্ঠে কখনোই কৌশলগত ত্রুটি না থাকলেও, অনুভূতির ভার তার স্বরে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেত।
১৯৯০-এর দশকে বাংলা সঙ্গীতের ধারা পরিবর্তন শুরু হয়। কাবির সুমন ও মোহিনের ঘোড়াগুলির মতো শিল্পী ও ব্যান্ড নতুন সুর ও গীতিকবিতা নিয়ে আসেন, তবে মুখোপাধ্যায়ের শৈলী তবু আলাদা রয়ে যায়। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত তার প্রথম অ্যালবাম “যেতে হবে” তে তিনি কণ্ঠকে প্রধান স্থান দিয়ে, সঙ্গীতের সরলতা ও মানবিকতা তুলে ধরেছেন।
এই অ্যালবামে যন্ত্রের ব্যবহার সীমিত ছিল, তবে গানের মাঝখানে বিরতি না দিয়ে কণ্ঠের স্বরকে পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়েছে। তার গানের স্বরভঙ্গি, কণ্ঠের কম্পন ও মানবিক ত্রুটি শোনার জন্য একধরনের সততা ও স্বচ্ছতা প্রদান করত, যা সমসাময়িক গায়কদের মধ্যে বিরল ছিল।
মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্টিগুলো শুধুমাত্র সুরের মেলোডি নয়, বরং সামাজিক সচেতনতায়ও ভূমিকা রাখে। “ডিঙা ভাসাও সাগরে” এবং “ফেব্রুয়ারি একুশ তারিখ” মত গানগুলো শ্রমিক সংগ্রাম, জাতীয় গর্ব ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে গানের মাধ্যমে তুলে ধরেছে। এসব গানে তিনি ভাষা আন্দোলনের আত্মা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পুনরুজ্জীবিত করেছেন।
তার গানের লিরিক্সে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ পায়। তিনি প্রায়ই গানকে জীবনের প্রতিফলন হিসেবে দেখেন, যেখানে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং প্রতিরোধের অস্ত্র এবং আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি। এই দৃষ্টিভঙ্গি তার শৈলীর মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য ছিল তার স্বতঃস্ফূর্ততা ও সরলতা। তিনি কোনো বিশাল ব্যান্ডের সঙ্গে না গিয়ে, একাকী কণ্ঠে গানের মর্ম প্রকাশ করতেন, যা শ্রোতাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ গড়ে তুলত। তার গানের সুরে কখনোই অতিরিক্ত সজ্জা না থাকায়, শোনার অভিজ্ঞতা স্বচ্ছ ও স্পষ্ট থাকত।
তার মৃত্যু সংবাদে বহু শিল্পী ও সমালোচক তার অবদানের প্রশংসা করেছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, তার গানের মাধ্যমে বাংলা গানের ঐতিহ্য ও সামাজিক দায়িত্বের মিশ্রণ ঘটেছে, যা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্ম বাংলা গানের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে রয়ে যাবে। তার কণ্ঠের স্বর, গানের বিষয়বস্তু ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি একসাথে বাংলা সংস্কৃতির সমৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যকে তুলে ধরেছে।
তার শেষ দিনগুলোতে, শোয়ায় বসে গাইতে গাইতে তিনি যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন “আহ, কিছু হবে না”, তা তার জীবনের দর্শনকে প্রকাশ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, গান গাওয়া নিজেই মৃত্যুর মুখে সাহসের প্রতীক।
মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্টিগুলো এখনো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে শোনা যায় এবং নতুন শিল্পী তাদের থেকে অনুপ্রেরণা নেয়। তার গানের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গর্ব ও দায়িত্বের বার্তা আজও জীবন্ত।



