রাজশাহীর বাটার মোড়ে অবস্থিত একটি ছোট, নামবিহীন জিলাপি দোকান রমজানের প্রথম দিনে দুপুর পর্যন্ত গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি তৈরি করেছে। কোনো সাইনবোর্ড না থাকলেও শহরের বাসিন্দারা মচমচে, টসটসে জিলাপির জন্য এই জায়গা চেনে। ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই স্থানে উৎপাদন চালিয়ে আসা এই দোকান রমজান মাসে বিশেষভাবে ব্যস্ত হয়ে ওঠে, যেখানে বিক্রয় গড়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হয়।
বিকালের দিকে নগরের বাটার মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট দোকানের সামনে একের পর এক মোটরসাইকেল থেমে আছে। গ্রাহকরা এক কেজি থেকে তিন কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন পরিমাণে জিলাপি কিনছেন; কেউ সরাসরি প্যাকেট ভর্তি করে নেন, আবার কেউ সঙ্গে নিমকি বা মাঠা নেন। দোকানের দুজন কারিগর হাতে হাতে তেল গরম করে, তাজা জিলাপি ভাজা ও প্যাকেজিং করে গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন।
দোকানের উৎপত্তি ১৯৫০ সালের দিকে, যখন সোয়েব উদ্দিন প্রথমবারের মতো জিলাপি বানানো শুরু করেন। তার একমাত্র সহকারী ছিলেন জামিলী সাহা, যিনি পরবর্তীতে তার পুত্র কালীপদ সাহার সঙ্গে ১৯৭২ থেকে কাজ শুরু করেন। ১৯৮০ সালে জামিলীর মৃত্যুতে কালীপদ প্রধান কারিগর হয়ে ওঠেন এবং ২০১৭ পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। কালীপদের মৃত্যুর পর তার শিষ্য মো. সাফাত বর্তমান উৎপাদনের দায়িত্বে আছেন, আর সঙ্গে আরেকজন কারিগর কাজ করছেন।
সোয়েব উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার চার সন্তান দোকান পরিচালনা করেন; তাদের মধ্যে তিনজনকে ব্যস্ত সময়ে কাজ করতে দেখা যায়। তাদের একজন, মো. শামীম, উল্লেখ করেন যে দোকানটি সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার না করে চালু রয়েছে। তিনি বলেন, “বাপ-দাদার রেখে যাওয়া ঐতিহ্যিক পদ্ধতি বজায় রেখে আমরা আজও একই স্বাদ ও গুণমান প্রদান করছি।” এই সততা ও মানের ওপর জোরই তাদের দীর্ঘস্থায়ী গ্রাহক ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
দোকানটি সারা বছরই বিক্রি করে, তবে রমজান মাসে চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। উচ্চ চাহিদা সত্ত্বেও দাম স্থিতিশীল থাকে; বর্তমানে প্রতি কেজি জিলাপির মূল্য ২২০ টাকা। এই মূল্য নির্ধারণের পেছনে কাঁচামালের গুণমান ও হস্তশিল্পের শ্রমিকের দক্ষতা রয়েছে। মো. সাফাত, যিনি ৪৩ বছর ধরে এই কাজ করছেন, বলেন, “উপকরণ সঠিক না হলে স্বাদ ঠিক থাকে না; তাই আমরা সর্বদা তাজা তেল ও শুদ্ধ ময়দা ব্যবহার করি।” তার নিপুণ হাতের ঘূর্ণনে তৈরি হওয়া জিলাপি গরম তেলে ভাজা হয়ে রস শোষণ করে স্বাদ অর্জন করে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রতি গ্রাহকের আস্থা ও স্বাদ পছন্দই এই দোকানের মূল শক্তি। রমজানের সময় গ্রাহক সংখ্যা ও বিক্রয় পরিমাণে তীব্র বৃদ্ধি, ব্যবসার মৌসুমী বৈশিষ্ট্যকে নির্দেশ করে। তবে এই নির্ভরতা একধরনের ঝুঁকি বহন করে; রমজান ছাড়া অন্যান্য সময়ে বিক্রয় তুলনামূলকভাবে কম থাকে, যা আয় প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হস্তশিল্পের আকর্ষণ হ্রাস পেলে কারিগর ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
দোকানের বর্তমান মূল্য নির্ধারণ এবং গুণমান বজায় রাখার নীতি, রমজানে উচ্চ মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। তবে ভবিষ্যতে বাজারের পরিবর্তন, যেমন স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি বা বিকল্প মিষ্টি পণ্যের প্রবেশ, মোকাবিলার জন্য পণ্য বৈচিত্র্যকরণ বা আধুনিক বিপণন কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন হতে পারে।
সংক্ষেপে, বাটার মোড়ে এই ৭৫ বছরের পুরোনো জিলাপি দোকান রমজানে চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে আয় বৃদ্ধি পায়, তবে বছরের বাকি সময়ে বিক্রয় স্থিতিশীল রাখতে গুণমান ও ঐতিহ্য বজায় রাখা, পাশাপাশি নতুন গ্রাহক গোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করার জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা জরুরি।



