জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এআই প্রযুক্তির ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা জানিয়ে বিশ্ব এআই সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দাবি করেছেন। এই বক্তব্য বৃহস্পতিবার ভারতের আয়োজিত সম্মেলনে দেওয়া হয়, যেখানে এআই‑এর ভবিষ্যৎ কেবল অল্প ধনকুবেরের মর্জিতে সীমাবদ্ধ না রাখার প্রয়োজন জোর দেওয়া হয়।
গুতেরেস উল্লেখ করেন, এআই‑এর দিকনির্দেশনা কয়েকটি সমৃদ্ধ দেশের হাতে সীমাবদ্ধ হলে বৈশ্বিক বৈষম্য দ্রুত বাড়বে। তাই দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে প্রযুক্তি সুবিধা ও ক্ষতি দুটোই অপ্রতুলভাবে বিতরণ হবে, যা বিশ্বব্যাপী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফাঁক আরও গভীর করবে।
একই সঙ্গে তিনি এআই‑কে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে চিকিৎসা, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং সরকারি সেবা প্রদান ক্ষেত্রে বিপ্লবী পরিবর্তন আনতে পারে বলে উল্লেখ করেন। উদাহরণস্বরূপ, রোগ নির্ণয়ে দ্রুততর অ্যালগরিদম, দূরশিক্ষার মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং ফসলের উৎপাদন পূর্বাভাসে উন্নতি সম্ভব।
তবে গুতেরেস সতর্ক করেন, একই প্রযুক্তি যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চালু করা হয় তবে তা বৈষম্য বাড়াতে, পক্ষপাতিত্ব উসকে দিতে এবং ব্যক্তিগত ক্ষতি ঘটাতে পারে। এআই‑এর অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া এবং ডেটা সংগ্রহের পদ্ধতি যদি ন্যায্য না থাকে, তবে সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য আরও তীব্র হবে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য জাতিসংঘ একটি বৈশ্বিক এআই বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছে, যা বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নীতি‑নির্ধারণে সহায়তা করবে। কমিটি এআই‑এর নৈতিক ব্যবহার, নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় নিশ্চিত করার কাজ করবে।
গুতেরেস আরও জোর দিয়ে বলেন, এআই‑এর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি ‘গ্লোবাল ফান্ড অন এআই’ গঠন করা জরুরি। এই তহবিলের মূল উদ্দেশ্য হল উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এআই‑এর সুবিধা পেতে আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং প্রযুক্তি গ্রহণে প্রাথমিক সক্ষমতা গড়ে তোলা।
সম্মেলনে ওপেনএআই‑এর স্যাম অল্টম্যান এবং গুগল‑এর সুন্দর পিচাই সহ শীর্ষ প্রযুক্তি নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন। গুতেরেস উল্লেখ করেন, তহবিলের লক্ষ্য ৩০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করা, যা একটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানির বার্ষিক আয়ের এক শতাংশের চেয়েও কম। এই পরিমাণের বিনিয়োগ এআই‑এর সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে যথেষ্ট হবে।
বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও, গুতেরেসের মতে, এই তহবিল না গঠন করলে অনেক দেশ এআই‑এর মূলধারার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ফলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবধান আরও বাড়বে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে পিছিয়ে থাকবে।
এআই‑এর দ্রুত প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গুতেরেস ডেটা সেন্টারগুলোকে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে আহ্বান জানান, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত পরিবেশগত বোঝা না পড়ে।
সারসংক্ষেপে, গুতেরেসের বক্তব্য এআই‑কে ন্যায্য, নিরাপদ এবং সমতাপূর্ণভাবে ব্যবহার করার জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বয়, আর্থিক সহায়তা এবং পরিবেশগত দায়িত্বের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। এই নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে এআই প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য সত্যিকারের উপকারি সরঞ্জাম হিসেবে কাজ করতে পারবে।



