মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় টিকরপাড়া গ্রামে বৃহস্পতিবার বিকেলে হেলিকপ্টার অবতরণ করে চীনের বাসিন্দা এক কনে। গৃহবধূ ক্রিস হো, শাংহাইতে বসবাসরত, তার স্বামী সুকান্ত সেনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক হিন্দু বিয়ের প্রস্তুতি চলমান। হেলিকপ্টারটি বিকেল চারটার দিকে কামারচাক ইউনিয়নের টিকরপাড়া গ্রাম মাঠে অবতরণ করে, যেখানে গ্রামবাসীর বিশাল ভিড় অপেক্ষা করছিল।
সুকান্ত সেন, স্বামী, স্বল্প বয়সে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে প্রায় আট বছর আগে চীনে গমন করেন। শাংহাই মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি থেকে অতিরিক্ত ডিগ্রি অর্জন করে আমদানি‑রপ্তানি ব্যবসা শুরু করার পরই তিনি ক্রিস হোকে পরিচয় করেন। দুজনের বিবাহ ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি চীনে অনুষ্ঠিত হয়। এখন দুজনের পরিবার বাংলাদেশে হিন্দু রীতিতে আনুষ্ঠানিক বিয়ের আয়োজন করেছে।
গ্রামবাসীর চোখে এই ঘটনা এক রকমের উৎসবের মতো। হেলিকপ্টার অবতরণের আগে গ্রামটি সাদা ও রঙিন কাপড়ে সজ্জিত করা হয়, গলিতে লাল পতাকা টাঙিয়ে অস্থায়ী হেলিপ্যাড তৈরি করা হয়। মাঠে সাজানো রঙিন চাদর, আলোকসজ্জা এবং ফুলের মালা গৃহপরিবারের স্বাগতকে আরও রঙিন করে তুলেছে। হেলিকপ্টার থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা গৃহবধূকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানায়, পরে প্রদীপ জ্বালিয়ে তাকে ঘরে নিয়ে যায়।
স্থানীয় বয়স্কদের কথায়, হেলিকপ্টার দেখা এবং বিদেশি কনে স্বাগত জানানো এই গ্রামে প্রথমবারের মতো। ৭৫ বছর বয়সী সুপ্রভা দে, চাটিগাঁও গ্রাম থেকে আসা, বলেন, তিনি জীবনে কখনো হেলিকপ্টার কাছ থেকে দেখেননি এবং এ ধরনের আয়োজন আগে কখনো দেখেননি। একই গ্রাম থেকে শর্মি ধর জানান, দূরদেশের বউকে দেখতে আসা তাদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা।
সুকান্তের বোন ঐশী সেন, বর্তমানে শাংহাই মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন, উল্লেখ করেন, ক্রিস হো দ্রুতই পরিবারের সকলের প্রিয় হয়ে গেছেন এবং তিনি নিজে ঐতিহ্যবাহী বিয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ক্রিস হো, স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন, বলেন, বাংলাদেশে এই দ্বিতীয় সফর এবং গ্রামবাসীর আন্তরিকতা তাকে মুগ্ধ করেছে। হেলিকপ্টারে করে গ্রামে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা তার জন্য বিশেষ আনন্দের।
বিবাহের মূল অনুষ্ঠান ২১ ফেব্রুয়ারি গায়েহলুদ এবং ২২ ফেব্রুয়ারি বিয়ের দিন নির্ধারিত হয়েছে। গায়েহলুদের সময় গ্রামটি আরও রঙিন সাজসজ্জা, সঙ্গীত ও নৃত্য দিয়ে সজ্জিত হবে বলে জানা গেছে। বিয়ের দিনেও গ্রামবাসী ও আত্মীয়স্বজনের বিশাল সমাবেশ প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে টিকরপাড়া গ্রাম প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক দৃষ্টিগোচরে এসেছে। হেলিকপ্টার অবতরণ, বিদেশি কনের আগমন এবং ঐতিহ্যবাহী হিন্দু রীতির সমন্বয় গ্রামকে এক অনন্য সাংস্কৃতিক মঞ্চে পরিণত করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
গ্রামবাসীর জন্য এই বিয়ের আয়োজন কেবল একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, বরং নতুন দিগন্তের সূচনা। হেলিকপ্টার থেকে নামা গৃহবধূকে স্বাগত জানাতে গৃহপরিবারের তরফ থেকে সাজানো ফুলের মালা, আলো জ্বালানো এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার গ্রামবাসীর হৃদয়ে গর্বের অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছে। ভবিষ্যতে এমন ধরনের আন্তর্জাতিক সংযোগের সম্ভাবনা বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



