প্রযোজনা ডিজাইনার জ্যাক ফিস্ক ‘মার্টি সুপ্রিম’ ছবির জন্য ১৯৫০‑এর নিউ ইয়র্কের লোয়ার ইস্ট সাইড ও টোকিওর একটি ঐতিহাসিক টেবিল টেনিস পার্লার পুনর্নির্মাণে কাজ করেছেন। ছবিতে টিমোথি শালামেটের চরিত্রের যাত্রা, তীব্র টেনিস ম্যাচ থেকে শুরু করে নিউ ইয়র্কের টেনেমেন্ট, ইংল্যান্ডের গুইনেথ প্যালট্রোর সঙ্গে সাক্ষাৎ, ফিফথ অ্যাভিনিউয়ের বিলাসবহুল বাড়ি এবং শেষমেশ জাপানের পার্কে সমাপ্তি পর্যন্ত, ফিস্কের নকশা প্রতিটি ধাপকে বাস্তবিক রঙে রাঙিয়ে তুলেছে।
জ্যাক ফিস্কের ক্যারিয়ার বহু দিগন্ত অতিক্রম করেছে; টেরেন্স মালিকের ‘বেডল্যান্ডস’, ডেভিড লিঞ্চের ‘মুলাহল্যান্ড ড্রাইভ’, ব্রায়ান ডি পামারার ‘ক্যারি’, পল থমাস অ্যান্ডারসনের ‘দ্যেয়ার উইল বি ব্লাড’, আলেহান্দ্রো গনজালেজ ইনার্রিটুরের ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ এবং মার্টিন স্করসেসের ‘কিলারস অফ দ্য ফ্লাওয়ার মুন’ সহ বহু আইকনিক ছবিতে তিনি প্রোডাকশন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছেন। তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে তিনটি অস্কার নোমিনেশন পেয়েছেন এবং ‘মার্টি সুপ্রিম’ দিয়ে চতুর্থ নোমিনেশন অর্জন করেছেন।
ফিল্মের গল্পের কেন্দ্রে থাকা টেনিস পার্লারটি বাস্তবে আর নেই; তবে ফিস্কের গবেষণা ও নকশা দল ঐ সময়ের ফটোগ্রাফ, মানচিত্র ও পুরনো রেকর্ডের সাহায্যে সেটি পুনরায় তৈরি করেছেন। প্রথমে লোয়ার ইস্ট সাইডের টেনেমেন্ট বাড়ি, ছোট দোকান ও রাস্তার বিক্রেতাদের পুনর্নির্মাণ করা হয়, যাতে চরিত্রের শৈশবের পরিবেশকে সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। এরপর ১৯৫০‑এর শৈলীর টেবিল টেনিস টেবিল ও পার্লারের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা যুক্ত করা হয়, যাতে দর্শকরা সেই সময়ের গন্ধ ও শব্দ কল্পনা করতে পারে।
চূড়ান্ত ম্যাচের দৃশ্যের জন্য টোকিওর একটি পার্কে শুটিং করা হয়। লোকেশনটি এমনভাবে নির্বাচিত হয়েছে যে তা ১৯৫০‑এর জাপানি নগরীর পার্কের চেহারা ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পার্কের পুরনো কাঠের বেঞ্চ, গাছের ছায়া ও ঐতিহ্যবাহী লণ্ঠনগুলোকে পুনরায় সাজিয়ে সেটি ছবির সময়ের সঙ্গে মেলানো হয়েছে। এই স্থানীয় গবেষণা ও সেট ডিজাইনের সমন্বয়ই ছবির সময়বোধকে জীবন্ত করে তুলেছে।
ফিস্ক ছবির চরিত্রের জীবনের ধাপগুলোকে ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, চরিত্রের প্রথম দিনগুলো লোয়ার ইস্ট সাইডের টেনেমেন্টে কাটে, যেখানে তার টেনিসের প্রথম স্বপ্ন জন্ম নেয়। পরবর্তীতে সে ইংল্যান্ডে গিয়ে গুইনেথ প্যালট্রোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, যা তার জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এরপর ফিফথ অ্যাভিনিউয়ের বিলাসবহুল বাড়িতে বসবাসের মাধ্যমে সে সমাজের উচ্চতর স্তরে পৌঁছায়, এবং শেষমেশ জাপানে টেনিসের চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। ফিস্কের মতে, এই সব পরিবর্তনের মূল ভিত্তি হল চরিত্রের শৈশবের টেনেমেন্ট, যা তার সব সিদ্ধান্তের ভিত্তি গঠন করে।
জোশ সাফডির সঙ্গে কাজ করা ফিস্কের জন্য নতুন উদ্দীপনা নিয়ে এসেছে। সাফডি প্রোডাকশন ডিজাইনের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখিয়ে প্রতিটি ধাপে তার ধারণা শেয়ার করেন; তিনি প্রায়ই ফোনে আঙুল দিয়ে স্কেচ তৈরি করে তা ফিস্কের কাছে পাঠাতেন। এই পারস্পরিক সৃজনশীলতা শুটিং লোকেশন ভ্রমণ, গবেষণা ও নকশা পরিকল্পনা করার সময় উভয়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছিল। ফিস্ক উল্লেখ করেছেন, সাফডির উত্সাহের ফলে তারা একসাথে পুরনো ফটো, নগর পরিকল্পনা নথি এবং ঐতিহাসিক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে সঠিক সময়ের পরিবেশ পুনরায় তৈরি করতে পেরেছেন।
ফিস্ক নিজেই ১৯৬০‑এর দশকে নিউ ইয়র্কে বসবাস করতেন; তাই লোয়ার ইস্ট সাইডের গলির গন্ধ, পুরনো ইটের বাড়ি ও রাস্তার বিক্রেতাদের দৃশ্য তার স্মৃতিতে গভীরভাবে সংযুক্ত। এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাকে সেটের প্রতিটি কোণায় সত্যিকারের সময়ের ছাপ রাখতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, নিউ ইয়র্কের সেই সময়ের স্মৃতি তাকে টেনেমেন্টের টেক্সচার, জানালার ফ্রেম ও সিঁড়ির ধ্বনির পুনর্নির্মাণে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে।
ফিল্মের শেষ পর্যন্ত, টেনিস পার্লার ও টেনেমেন্টের পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে চরিত্রের যাত্রা একটি দৃশ্যমান রূপ পেয়েছে, যা দর্শকদের সময়ের সঙ্গে চরিত্রের সংযোগ অনুভব করতে সাহায্য করে। ফিস্কের কাজের মূল লক্ষ্য ছিল চরিত্রের পরিবেশকে জীবন্ত করা, যাতে দর্শকরা তার জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তার অনুভূতি ও সংগ্রামকে সরাসরি অনুভব করতে পারে। এই প্রচেষ্টা ‘মার্টি সুপ্রিম’কে শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
ফিস্কের নকশা দল এবং সাফডির সৃজনশীল সহযোগিতা ছবির ভিজ্যুয়াল সত্যতা ও শিল্পগত মানকে নতুন স্তরে নিয়ে গেছে। তাদের যৌথ প্রচেষ্টা দেখায় যে, সঠিক গবেষণা, ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে পুনরায় জীবন্ত করা সম্ভব। ‘মার্টি সুপ্রিম’ এর মাধ্যমে জ্যাক ফিস্কের এই সাফল্য প্রোডাকশন ডিজাইনের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে এবং ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।



