বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বৃহস্পতিবার একটি বিবৃতিতে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও মহান শহীদ দিবসের যথাযথ মর্যাদায় পালন করার জন্য দেশবাসীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে এই দিনটি দেশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এবং তা সঠিকভাবে উদযাপন করা উচিত।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের স্মরণীয় দিন, যখন ছাত্র-যুবসমাজ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। ঐ আন্দোলনের ফলে বহু শহীদ ত্যাগ স্বীকার করেন, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতিতে পরিণত হয়। এই দিনটি এখন বিশ্বব্যাপী ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকারকে সম্মান জানাতে উদযাপিত হয়।
ডা. শফিকুর রহমান জোর দিয়ে বলেন যে ভাষা শহীদদের সম্মান নিশ্চিত করতে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ও সামাজিক জীবনের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন যে সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, মিডিয়া এবং বিচার ব্যবস্থায় বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তার ও সুরক্ষার জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে শহীদদের স্বপ্ন পূরণ হবে না।
বক্তা আরও বলেন, বর্তমান সময়ে ভাষা দিবসের পালন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে জাতীয় ঐতিহ্যকে সম্মান করা উচিত এবং নতুন সরকারকে ভাষা আন্দোলনের মূল্যবোধ রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে জনগণ নিরাপদে চলাচল করতে পারে এবং তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষিত থাকে। এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারকে কাজ করতে হবে, তিনি জোর দেন।
বিবৃতিতে তিনি জামায়াতের সকল শাখা ও সদস্যদের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও মহান শহীদ দিবসের উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজনের জন্য আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে এ ধরনের অনুষ্ঠানগুলো দিবসের মর্যাদা বৃদ্ধি করবে এবং ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি জোরদার করবে। শাখাগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণকে তিনি উৎসাহিত করেন।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ, যা ঐতিহাসিকভাবে ভাষা আন্দোলনের প্রধান সমর্থক, জামায়াতের এই আহ্বানকে রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছে। দলটি দাবি করে যে ভাষা দিবসের উদযাপনকে কোনো দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভাষা দিবসের সংবেদনশীলতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, জামায়াতের আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো নতুন বিএনপি সরকারের সংস্কৃতি সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জনমত গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। যদি এই অনুষ্ঠানগুলো শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত হয়, তবে তা পার্টিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ইঙ্গিত হতে পারে। অন্যদিকে, কোনো বিরোধ উদ্ভব হলে তা প্রশাসনের প্রথম মাসে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
বিভিন্ন জেলা থেকে নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক, তারা স্থানীয় স্তরে ভাষা শহীদদের সম্মান জানাতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। কবিতা পাঠ, আলোচনা সেমিনার এবং ধর্মীয় দোয়া মিলিয়ে একটি সমন্বিত প্রোগ্রাম পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই ধরনের ভিত্তি-স্তরের অংশগ্রহণ ভাষা দিবসের স্থায়িত্বকে আরও দৃঢ় করবে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় পূর্বে জাতীয় পর্যায়ে ভাষা দিবসের অনুষ্ঠান সমর্থন করার ঘোষণা দিয়েছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সমাজের সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করার পরিকল্পনা করেছে। কর্মকর্তারা আশা করেন যে সকল পক্ষের সহযোগিতায় একটি সুসংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ উদযাপন সম্ভব হবে। এই সমন্বয়জনিত প্রচেষ্টা জনশান্তি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ডা. শফিকুর রহমান শেষ করে বলেন যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ একটি সমষ্টিগত দায়িত্ব, যা কোনো একক দল বা ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি সকল বাংলাদেশীর কাছে আহ্বান জানান ১৯৫২ সালের শহীদদের ত্যাগ স্মরণ করে ভবিষ্যতে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে যেখানে মাতৃভাষা পূর্ণ সম্মান পায়। এভাবে ভাষা শহীদদের আত্মা চিরকাল বেঁচে থাকবে এবং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হবে।



