বিশ্বের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছে। শিক্ষার্থীর চিটিং নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি, এআই শিক্ষার মৌলিক কাঠামোকে কীভাবে পরিবর্তন করছে, তা এখন প্রধান আলোচ্য বিষয়। এই পরিবর্তনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য ও ভূমিকা পুনর্বিবেচনার দরকার তৈরি করছে।
এআই ব্যবহারের প্রথম স্তরটি প্রায়শই অদৃশ্য থাকে; স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমগুলো সম্পদ বণ্টন, ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থী সনাক্তকরণ, কোর্স সময়সূচি সমন্বয় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সহায়তা করে। এসব প্রক্রিয়া দ্রুত ও সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়, ফলে কর্মীসংখ্যা কমে এবং ব্যয় হ্রাস পায়।
দ্বিতীয় স্তরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সরাসরি এআই টুল ব্যবহার করে। শিক্ষার্থীরা প্রবন্ধের সারাংশ তৈরি, নোট সংক্ষিপ্তকরণ এবং বিষয়বস্তু দ্রুত বুঝতে এআই ব্যবহার করে। শিক্ষকরা কোর্সের পরিকল্পনা, অ্যাসাইনমেন্ট এবং সিলেবাস তৈরিতে এআইকে সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করছেন।
গবেষকদের জন্য এআই আরও শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কোড লেখা, সাহিত্য পর্যালোচনা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ কাজকে কয়েক মিনিটে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। ফলে গবেষণার গতি বাড়লেও, মানবিক বিশ্লেষণ ও সমালোচনামূলক চিন্তার স্থান সংকুচিত হতে পারে।
চিটিং বা কাজ এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই বিদ্যমান, তবে এআইয়ের বিস্তৃত প্রয়োগ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যখন মেশিন গবেষণা ও শিক্ষার কাজের বেশিরভাগ অংশ গ্রহণ করে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কী রয়ে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর না দিলে শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হতে পারে।
গত আট বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের উমাস বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড এথিক্স সেন্টার এবং ইন্সটিটিউট ফর এথিক্স অ্যান্ড এমার্জিং টেকনোলজিসের যৌথ গবেষণা এআই ব্যবহারের নৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে আসছে। সাম্প্রতিক একটি শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এআই সিস্টেম যত স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে, ততই তার ব্যবহার সংক্রান্ত নৈতিক দায়িত্ব বাড়বে।
শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, এআই যখন কোর্স ডিজাইন, প্রবন্ধ রচনা, পরীক্ষার ধারণা এবং জটিল পাঠ্যাংশের সংক্ষিপ্তসার তৈরি করতে সক্ষম হবে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না, বরং শিক্ষার ও পরামর্শের পরিবেশকে শূন্যতায় পরিণত করার ঝুঁকি থাকে।
এ ধরনের পরিবর্তন শিক্ষার্থীর স্বতন্ত্র চিন্তা, বিশ্লেষণ এবং সৃজনশীলতা হ্রাসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। শিক্ষক ও পরামর্শদাতার ভূমিকা যদি মেশিনের মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হয়, তবে শিক্ষার মানদণ্ড ও মানসিক বিকাশে বড় ফাঁক দেখা দিতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন এআইকে কীভাবে সংহত করবে, তা নির্ধারণের সময় নৈতিক নীতি, শিক্ষার গুণগত মান এবং মানবিক মিথস্ক্রিয়ার গুরুত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের সুবিধা ব্যবহার করে প্রশাসনিক কাজ কমানো সম্ভব, তবে শিক্ষার মূল প্রক্রিয়ায় মানবিক স্পর্শ বজায় রাখা জরুরি।
শিক্ষা নীতিনির্ধারক ও বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বের জন্য প্রস্তাবিত হচ্ছে, এআই ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট নীতি তৈরি করা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে এআইয়ের সীমা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নিয়মিত নৈতিক মূল্যায়ন চালানো। এভাবে প্রযুক্তি ও মানবিক শিক্ষার সমন্বয় সম্ভব হবে।
অবশেষে, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ব্যবহারিক পরামর্শ: এআই টুলকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করুন, তবে নিজের বিশ্লেষণ ও লেখনীকে অগ্রাধিকার দিন। যখন কোনো কাজ এআই দিয়ে সম্পন্ন করেন, তখন তা পুনরায় পড়ে নিজের ভাষায় পুনর্লিখন করুন; এভাবে প্রযুক্তি এবং স্বতন্ত্র শিক্ষার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।



