ইরানের তেহরানের ইভিন কারাগারে বন্দী ব্রিটিশ নাগরিক লিন্ডসে ফোরম্যান এবং তার স্বামী ক্রেগ ফোরম্যানকে ১০ বছরের স্পাই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। শাস্তি শোনার কয়েক ঘণ্টা আগে লিন্ডসে টেলিফোনে জেলার কঠিন পরিস্থিতি বর্ণনা করেন, যেখানে তিনি মানসিক ও শারীরিক দু’ই দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন।
দম্পতি জানুয়ারি ২০২৫-এ বিশ্বব্যাপী মোটরসাইকেল ভ্রমণের অংশ হিসেবে ইরানের মধ্য দিয়ে গমনকালে গ্রেফতার হন। গ্রেফতারের পর থেকে তারা প্রায় এক বছর তেহরানের ইভিন কারাগারে ‘অত্যন্ত কঠিন’ শর্তে আটক ছিলেন। তাদের আটককালীন অবস্থার বর্ণনা লিন্ডসে “মনের জন্য একটি সহনশীলতা পরীক্ষা” বলে প্রকাশ করেন এবং জেলার শারীরিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন।
দম্পতি স্পাই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং অক্টোবর মাসে তেহরানের রেভোলিউশনারি কোর্টে তিন ঘণ্টার শুনানিতে তাদের রক্ষা করার সুযোগ পাননি। শাস্তি ব্রাঞ্চ ১৫-এ দেওয়া হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি বলে তাদের পুত্র জো বেনেটের দাবি। বেনেট ইরানি কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তকে “হৃদয়বিদারক” বলে উল্লেখ করে, এবং ব্রিটিশ সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
লিন্ডসে এবং ক্রেগ ফোরম্যান ইরানি কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে তারা তাদের বর্তমান অবস্থার বিরুদ্ধে আপিল করেন। লিন্ডসে চিঠিটিকে “নিরাশার্ত প্রচেষ্টা” বলে বর্ণনা করেন এবং ইরানের আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান ও ধৈর্য্য বজায় রাখার কথা জানান, তবে তাদের নির্দোষতা স্বীকৃত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আপনার নিজের সিস্টেমে আপনি নিজের আইন লঙ্ঘন করছেন।”
ব্রিটিশ সরকার এই মামলায় কূটনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের মুখপাত্রের মতে, ইরানের এই রায় আন্তর্জাতিক আইনের নীতির বিরোধী এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাবনা রয়েছে। বিদেশী বিষয়ক মন্ত্রী ইয়েভেট কুপার এই শাস্তিকে “সম্পূর্ণভাবে নিন্দনীয় এবং অযৌক্তিক” বলে সমালোচনা করেন এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দম্পতির মুক্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই মামলাটি ইরান-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনার একটি নতুন স্তরে নিয়ে গেছে। পূর্বে উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপের অভাব এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত বিরোধের ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর চাপ বাড়ছে। ইরানের রেভোলিউশনারি কোর্টের রায়ের পর, ব্রিটিশ সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থার সমর্থন চেয়ে দম্পতির মুক্তির জন্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে।
দম্পতির পুত্র জো বেনেটের মতে, ইরানি কর্তৃপক্ষের স্পাই অভিযোগের কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি এবং তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে “প্রতিটি উপলব্ধ উপায় ব্যবহার করে” তাদের মুক্তি নিশ্চিত করার অনুরোধ করেন। তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন শর্তে কষ্ট পাচ্ছে, এবং এখন আমাদের একমাত্র আশা হল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা।”
ইরানের রেভোলিউশনারি কোর্টের শাস্তি এবং দম্পতির জেলায় অবস্থার প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই সংস্থাগুলি ইরানের কারাগার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ দাবি করছে। একই সঙ্গে, ব্রিটিশ সরকার ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেল খুলে, দম্পতির মানবিক অবস্থা ও আইনি অধিকার রক্ষার জন্য চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা জানিয়েছে।
এই ঘটনা ইরান-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গঠনকে প্রভাবিত করতে পারে। উভয় দেশের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কোনো সরাসরি সমঝোতা প্রকাশ করেনি, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের রায়ের পুনর্বিবেচনা বা দম্পতির মুক্তির সম্ভাবনা বাড়তে পারে। সময়ের সাথে সাথে এই মামলায় কী ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।



