ইরান সরকারের দ্বারা লিন্ডসে ও ক্রেগ ফোরম্যান দম্পতিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দুজনই যুক্তরাজ্যের নাগরিক এবং বিশ্বব্যাপী মোটরসাইকেল সফরের অংশ হিসেবে জানুয়ারি ২০২৫-এ ইরানে আটক হন। ইরান সরকার তাদেরকে গুপ্তচরবৃত্তি অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে, যদিও দম্পতি এই অভিযোগ অস্বীকার করে। এই রায়ের ফলে দুজনের পরিবার এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ফোরম্যান দম্পতি জানুয়ারি ২০২৫-এ তেহরানের এভিন কারাগারে পৃথকভাবে রাখা হয়। এভিন কারাগার ইরান সরকারের দ্বারা রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য ব্যবহৃত একটি পরিচিত স্থাপনা, যেখানে মানবাধিকার সংস্থা দীর্ঘদিনের দমনমূলক শর্তের অভিযোগ তুলে এসেছে। দম্পতি এখন টিয়ারান শহরের রেভলিউশনারি কোর্টের শাখা ১৫-এ শাস্তি পেয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি, এবং আদালতে তাদের রক্ষা করার সুযোগও দেওয়া হয়নি।
দম্পতির সন্তান জো বেনেট্টের মতে, এখন পর্যন্ত ইরান সরকার কোনো গোয়েন্দা প্রমাণ প্রকাশ করেনি। তিনি ব্রিটিশ সরকারকে “দ্রুত এবং দৃঢ় পদক্ষেপ” নিতে আহ্বান জানিয়ে ইরান সরকারের এই রায়কে “সম্পূর্ণভাবে নিন্দনীয় ও অবৈধ” বলে সমালোচনা করেছেন। বেনেট্টের দাবি যে, তার বাবা-মা ১৩ মাস ধরে “অত্যন্ত কঠিন” পরিবেশে কষ্ট পাচ্ছেন, যেখানে ময়লা, কীটপতঙ্গ এবং সহিংসতা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে। তিনি আরও জানান যে, দম্পতি ওজন কমিয়ে ফেলেছেন এবং মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ইরান সরকারের এই রায়ের পর, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সচিব ইভেট কুপার তৎক্ষণাৎ মন্তব্য করে রায়কে “সম্পূর্ণভাবে নিন্দনীয় এবং সম্পূর্ণ অবৈধ” বলে উল্লেখ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দম্পতির অধিকার রক্ষার জন্য ব্রিটিশ সরকারের তৎপরতা দাবি করেন। কুপার এছাড়াও ইরান সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে দম্পতির মুক্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। এই মন্তব্যের পর, ব্রিটিশ সরকার ইরান সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় করে দম্পতির অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
দম্পতির আইনজীবীরা ইরান আদালতে তাদের ক্লায়েন্টের বিরুদ্ধে কোনো বৈধ আইনি ভিত্তি না থাকায় ব্যাখ্যা করেছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, ফোরম্যান দম্পতির জামিনের আবেদনগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে এবং তাদের রক্ষা করার কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি। এভিন কারাগারের অভ্যন্তরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সঙ্গে এই মামলাটি আন্তর্জাতিক নজরে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা ইরান সরকারের এই ধরনের রায়কে দেশীয় রাজনৈতিক দমন নীতি ও আন্তর্জাতিক চাপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন।
ইরানে পূর্বে অন্যান্য বিদেশি নাগরিকের ওপর একই রকম অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর নাগরিক অন্তর্ভুক্ত। এসব মামলায় প্রায়শই স্পষ্ট প্রমাণের অভাব এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রকাশ পায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই ধরনের রায়কে “অবৈধ বিচার” এবং “মানবিক অধিকার লঙ্ঘন” হিসেবে সমালোচনা করে। ফোরম্যান দম্পতির ক্ষেত্রে, ইরান সরকারের রায় আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সরকার এখন পর্যন্ত ইরান সরকারের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দম্পতির মুক্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। ফোরম্যান দম্পতির পরিবার জো বেনেট্টের কাছ থেকে জানানো হয়েছে যে, তিনি ব্রিটিশ সরকারকে “প্রতিটি সম্ভাব্য উপায় ব্যবহার করে” দম্পতির মুক্তি নিশ্চিত করতে অনুরোধ করেছেন। বেনেট্টের মতে, তার মা ও সৎপিতার অবস্থা দেখে তিনি “চিন্তার মধ্যে অসুস্থ” হয়ে গেছেন এবং সরকারকে “অবহেলিত” অনুভব করছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিবকে চিঠি লিখে এই বিষয়টি ত্বরান্বিত করার আবেদন করেছেন।
ইরান সরকারের রেভলিউশনারি কোর্টের শাখা ১৫-এ শাস্তি প্রদান করার পর, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, ইরান সরকার প্রায়শই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে। ফোরম্যান দম্পতির ক্ষেত্রে, কোনো স্বতন্ত্র তদন্ত বা প্রমাণ উপস্থাপন না করে রায় দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ডের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ।
এই রায়ের পর, ব্রিটিশ সরকার এবং ইরান সরকারের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে ইরান সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে দম্পতির অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় করেছে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং অন্যান্য দেশগুলোও ইরানের এই রায়ের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রকাশ করেছে এবং দম্পতির মুক্তি দাবি করেছে। ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ফোরম্যান দম্পতির পরিবার এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখন ইরান সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন কূটনৈতিক ও আইনি উপায় অনুসন্ধান করছে। জো বেনেট্টের মতে, ব্রিটিশ সরকারকে “প্রত্যেক সম্ভাব্য উপায় ব্যবহার করে” দম্পতির মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাদের মানবিক অধিকার রক্ষা পায়। ইরান সরকারের রায়ের বৈধতা এবং দম্পতির শর্তাবলী নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি অব্যাহত থাকবে। শেষ পর্যন্ত, এই মামলাটি ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হবে।



