বিদেশে পড়াশোনা বা কাজের জন্য গৃহবহির্ভূত জীবনযাপনকারী বাংলাদেশি তরুণরা খাবারের প্রতি তাদের মনোভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন। স্বদেশে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা খাবার, যখন দূরত্বের কারণে সীমিত হয়ে যায়, তখন তা নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়। এই পরিবর্তনটি শুধু স্বাদে নয়, সংস্কৃতিগত শকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবেও প্রকাশ পায়।
বাড়িতে মা‑এর রান্না, ভাত‑ডাল‑লেবু বা গরম চায়ের স্বাদকে স্বাভাবিক মনে করা হয়। তবে বিদেশে পৌঁছে প্রথমে রাইসের গঠন, মশলার তীব্রতা বা চায়ের গন্ধে অস্বাভাবিকতা অনুভব করা স্বাভাবিক। একবার স্বাদে ঘাটতি অনুভব করলে, ছোটখাটো খাবারও বিদেশি মনে হতে শুরু করে।
টেক্সাসের আরলিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী তিন মাসের মধ্যে রাইস ও গরুর মাংসের কারি রান্না শিখে নেন। এরপর তিনি একই দেশের আরেকজন সহপাঠীকে ঘরে তৈরি খাবার পরিবেশন করেন। সহপাঠীটি খাবারটি চেখে চোখে অশ্রু নিয়ে গেছেন, কারণ দীর্ঘদিনের পর প্রথমবার ঘরে তৈরি স্বাদ পেয়েছেন।
এই ধরনের অভিজ্ঞতা দূরত্বের ফলে স্বাভাবিকভাবে গৃহস্থ খাবারের প্রতি উদাসীনতা থেকে আকাঙ্ক্ষা গড়ে ওঠার উদাহরণ। বিদেশে বসবাসের ফলে স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি পায়; খাবার প্রস্তুত করা, মশলা মাপা এবং রেসিপি অনুসরণ করা শিখতে হয়। একই সঙ্গে মা‑বাবার সঙ্গে রাতের দেরি পর্যন্ত ফোনে যোগাযোগ করে রেসিপি শেয়ার করা, ইউটিউবের টিউটোরিয়াল থেকে পার্থক্যপূর্ণ স্বাদ অর্জনের চেষ্টা করা সাধারণ দৃশ্য।
খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহের সমস্যাও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশি মসলা, তেল, গমের আটা বা পান্তা ভাতের মতো মৌলিক উপকরণ পাওয়া কঠিন, এবং পাওয়া দোকানগুলোতে দাম প্রায়ই বেশি। ফলে স্বাদ বজায় রাখতে বিকল্প উপাদান ব্যবহার করতে হয়, যা কখনো কখনো মূল স্বাদের কাছাকাছি না আসতে পারে।
অনেক শিক্ষার্থী ও কর্মী এই সমস্যার সমাধান হিসেবে স্থানীয় সুপারমার্কেটের আন্তর্জাতিক বিভাগে অনুসন্ধান করেন, অথবা অনলাইন শপের মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্য অর্ডার করেন। তবে শিপিং সময় ও খরচের কারণে তা তৎক্ষণাত্ ব্যবহারযোগ্য নয়। ফলে ঘরে তৈরি খাবারের অভাবের অনুভূতি বাড়ে।
বহিরাগত পরিবেশে খাবারের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন শুধু স্বাদে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করে। স্বদেশের খাবারকে স্মরণ করে তৈরি করা চা, ভাত‑ডাল‑মাছের খাবার বা মিষ্টি, প্রায়ই আত্মিক সান্ত্বনা দেয় এবং একাকিত্বের অনুভূতি কমায়।
একই সময়ে, বিদেশে বসবাসের ফলে নতুন খাবারের প্রতি উন্মুক্ততা বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় রেস্টুরেন্টের খাবার চেষ্টা করা, বিভিন্ন সংস্কৃতির রান্না শিখা এবং নিজের রেসিপিতে মিশ্রণ করা নতুন স্বাদ গড়ে তোলে। এভাবে খাবার দু’টি দিক—স্মৃতি ও উদ্ভাবন—একসঙ্গে বিকশিত হয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক ক্যাম্পাসে খাবার সম্পর্কিত আলোচনা, সাংস্কৃতিক ইভেন্টে খাবার ভাগাভাগি এবং গ্রুপ প্রোজেক্টে রান্না করা, শিক্ষার্থীদের আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগকে সমৃদ্ধ করে। ফলে খাবার শুধু পুষ্টি নয়, সামাজিক সংযোগের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
অধিকাংশ বাংলাদেশি পরিবারে বাবা-মা সন্তানদের বিদেশে যাওয়ার পর রাতের দেরি পর্যন্ত ফোনে রেসিপি শেয়ার করেন। তারা প্রায়শই “কিভাবে গরম চা বানাবো” বা “ভাতের গন্ধ কেমন রাখতে পারি” নিয়ে পরামর্শ দেন। এই যোগাযোগের মাধ্যমে ঘরে না থাকলেও পারিবারিক বন্ধন বজায় থাকে।
বিদেশে বসবাসের সময় খাবারের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে চাইলে, কিছু ব্যবহারিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। প্রথমে, স্বদেশের মৌলিক মসলা ও উপকরণগুলো ছোট পরিমাণে সংগ্রহ করে রাখুন। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় বাজারে বিকল্প উপাদান খুঁজে বের করে নিজের রেসিপিতে সামান্য পরিবর্তন করুন, যাতে স্বাদ বজায় থাকে। তৃতীয়ত, বন্ধু বা সহপাঠীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ঘরে তৈরি খাবার ভাগাভাগি করুন; এতে একাকিত্ব কমে এবং স্বাদে সন্তুষ্টি বাড়ে।
আপনার কি বিদেশে বসবাসের সময় কোনো খাবারকে বিশেষভাবে মিস করেছেন? অথবা নতুন কোনো রেসিপি তৈরি করে স্বদেশের স্বাদকে আধুনিকভাবে উপস্থাপন করেছেন? আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে অন্যদের জন্য সহায়ক হতে পারে।



