আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ৯০ পৃষ্ঠার একটি নতুন ফৌজদারি কোড জারি করেছে, যার মধ্যে স্বামীকে স্ত্রীর ওপর শারীরিক শাস্তি দেওয়ার অনুমতি অন্তর্ভুক্ত। এই বিধি অনুযায়ী, স্বামী যদি তার স্ত্রী বা সন্তানকে শারীরিকভাবে শাস্তি দেন, তবে তা আইনগতভাবে বৈধ বলে গণ্য হবে, তবে নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে শাস্তি আরোপিত হবে।
নতুন দণ্ডবিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি স্বামী অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করে দৃশ্যমান আঘাত বা হাড় ভাঙার কারণ হন, তবে সর্বোচ্চ পনেরো দিনের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে এই শাস্তি কার্যকর হবে শুধুমাত্র তখনই, যখন ভুক্তভোগী স্ত্রী আদালতে তার শারীরিক ক্ষতি প্রমাণ করতে সক্ষম হবে।
প্রমাণের জন্য ভুক্তভোগীকে সম্পূর্ণ হিজাব পরা অবস্থায় তার আঘাত বিচারকের সামনে উপস্থাপন করতে হবে, এবং একই সময়ে তার স্বামী বা অন্য কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে আদালতে উপস্থিত থাকতে হবে। এই শর্ত পূরণ না হলে স্বামীর বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।
বিধিতে আরেকটি বিধান রয়েছে যে, বিবাহিত নারী স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে থাকলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের শাস্তি পেতে পারে। এই নিয়মটি নারীর চলাচল ও স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করে, যা পূর্বের সামাজিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দণ্ডবিধি সমাজকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে: ধর্মীয় বিদ্বান (উলামা), অভিজাত (আশরাফ), মধ্য শ্রেণি এবং নিম্ন শ্রেণি। একই ধরনের অপরাধের জন্য শাস্তি নির্ধারিত হবে অপরাধীর সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে, অপরাধের তীব্রতার উপর নয়।
ধর্মীয় পণ্ডিতদের ক্ষেত্রে, যদি তারা কোনো অপরাধ করেন, তবে তাদের শাস্তি শুধুমাত্র পরামর্শের সীমায় থাকবে এবং কোনো শারীরিক বা কারাদণ্ডের ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এই ধারা ধর্মীয় গোষ্ঠীর উপর বিশেষ রক্ষার ইঙ্গিত দেয়।
আশরাফ শ্রেণির সদস্যদের জন্য, অপরাধের পর আদালতে ডেকে পরামর্শ প্রদান করা হবে, তবে শারীরিক শাস্তি বা কারাদণ্ড আরোপের সম্ভাবনা কম। এই ব্যবস্থা উচ্চবিত্ত গোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ সুবিধা প্রদান করে।
মধ্য শ্রেণির অপরাধীদের ক্ষেত্রে, একই ধরনের অপরাধের জন্য কারাদণ্ড আরোপ করা হবে। দণ্ডবিধি অনুযায়ী, এই শ্রেণির সদস্যদের শাস্তি সাধারণত কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
নিম্ন শ্রেণির ব্যক্তিদের জন্য শাস্তি সবচেয়ে কঠোর হবে; তাদেরকে একই অপরাধে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের পাশাপাশি শারীরিক শাস্তি সহ্য করতে হবে। এই ধারা সামাজিক বৈষম্যকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
নতুন দণ্ডবিধি তালেবান সরকারের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা স্বাক্ষর করেছেন এবং তা ‘দ্য মাহাকুমু জাজাই উসুলনামা’ শিরোনামে আদালতে বিতরণ করা হয়েছে। ব্রিটিশ অনলাইন সংবাদপত্র ইন্ডিপেন্ডেন্টের মতে, এই নথি ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন আদালতে পৌঁছে গেছে।
এই আইনটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছ থেকে ব্যাপক সমালোচনা উস্কে দিয়েছে, কারণ এটি পারিবারিক সহিংসতাকে বৈধ করে এবং নারীর মৌলিক অধিকারকে সীমাবদ্ধ করে। তালেবান সরকার দাবি করে যে, এই বিধি সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং ধর্মীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে প্রয়োজনীয়।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে, নতুন দণ্ডবিধি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিধিতে প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে নারীর অধিকার ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আলোচনায় তীব্রতা বাড়াবে। সরকার যদি এই বিধি কার্যকর করে, তবে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে এবং আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।



