দেশব্যাপী মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নৌ পুলিশ গত পাঁচ দিন ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালায়। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ৬৪ জনকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিশাল পরিমাণ অবৈধ জাল ও মাছ জব্দ করা হয়। মৎস্য ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পরিচালিত এই অভিযানটি দেশের জলপথে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অভিযানটি দেশের বিভিন্ন নদী ও খাল জুড়ে পরিচালিত হয়, যেখানে নৌ পুলিশ দলগুলো অবৈধ জাল ব্যবহারকারী এবং অননুমোদিত মাছ ধরা কার্যক্রমের সন্ধান পায়। পাঁচ দিনের মধ্যে মোট ২ কোটি ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ৩৩০ মিটার জালের পরিমাণ জব্দ করা হয়েছে, যা প্রায় ৪০,০০০ টন জালের সমতুল্য। এই জালগুলো প্রায়ই ক্ষতিকারক উপকরণ দিয়ে তৈরি, যা জলে বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অভিযামের ফলস্বরূপ ২,৪০৯ কিলোগ্রাম মাছ এবং ৩০০ কিলোগ্রাম জেলিযুক্ত চিংড়ি জব্দ করা হয়েছে। জেলিযুক্ত চিংড়ি সাধারণত অবৈধ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে। জব্দকৃত মাছের মধ্যে ইলিশ, রুই এবং কাতলা সহ বিভিন্ন স্থানীয় প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা বাজারে বিক্রি হলে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারত।
অভিযানের সময় নদী থেকে ১১৯টি ঝোঁপঝাড় ধ্বংস করা হয়। এই কাঠামোগুলো প্রায়ই অননুমোদিতভাবে মাছের চাষের জন্য ব্যবহার করা হয়, যা পরিবেশগত ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জলের গুণগত মান হ্রাস করে। ধ্বংসের কাজ বিশেষজ্ঞ দলের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে, যাতে পরিবেশের উপর অতিরিক্ত ক্ষতি না হয়।
বৈধ কাগজপত্রের অভাবে ২৩টি বাল্কহেডের বিরুদ্ধে নৌ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নৌ আদালত এই মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে অবৈধ কার্যক্রমের দমন নিশ্চিত করবে। আদালতে প্রমাণ হিসেবে জব্দকৃত জাল, মাছ এবং চিংড়ি, পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর নথিপত্র উপস্থাপন করা হবে।
অভিযানের সময় ৬৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই অবৈধ জাল ব্যবহারকারী এবং অননুমোদিত মাছ ধরা কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের কাজ বর্তমানে চলমান, এবং তাদেরকে নৌ পুলিশ কেন্দ্রের নির্দিষ্ট সেলায় আটক রাখা হয়েছে। আটককৃতদের আইনগত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে এবং তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
মৎস্য আইন লঙ্ঘনের জন্য ১৯টি এবং বেপরোয়া গতি সংক্রান্ত ৭টি অভিযোগে মোট ২৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলাগুলো নৌ আদালতে শোনার জন্য নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট আইনগত ধারা অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করা হবে। বেপরোয়া গতি সংক্রান্ত অভিযোগগুলো মূলত দ্রুতগতি চালনা এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড লঙ্ঘনের ওপর ভিত্তি করে।
জব্দকৃত অবৈধ জাল এবং জেলিযুক্ত চিংড়ি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, যাতে সেগুলো পুনরায় ব্যবহার না হয়ে পরিবেশে ক্ষতি না করে। ধ্বংসের কাজ উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে এবং মেশিনে কুঁচিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে, যা পুনর্ব্যবহারের সম্ভাবনা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশগত ঝুঁকি কমিয়ে আনা হয়েছে।
বাকি থাকা মাছগুলো স্থানীয় এতিমখানায় দান করা হয়েছে, যাতে দরিদ্র শিশুদের পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা যায়। মোট ১৫টি এতিমখানা এই দানের সুবিধাভোগী হয়েছে, এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০০ কিলোগ্রাম মাছ বিতরণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগটি সমাজের প্রতি নৌ পুলিশের দায়িত্ববোধের প্রকাশ এবং মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে।
প্রসিকিউশন দল আগামী সপ্তাহে নৌ আদালতে প্রথম শুনানির তারিখ নির্ধারণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপনের পর আদালত যথাযথ শাস্তি নির্ধারণ করবে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ অবৈধ কার্যক্রমের প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে অতিরিক্ত জরিমানা এবং জেল শাস্তি আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
নৌ পুলিশ এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি রোধে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবে এবং মৎস্য সম্পদের সুরক্ষায় অতিরিক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করেছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত রাডার সিস্টেম এবং ড্রোন ব্যবহার করে নদী ও সমুদ্রের তদারকি বাড়ানো হবে। এছাড়া মৎস্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করা হবে।
এই বৃহৎ অভিযান দেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষা এবং নৌপথের নিরাপত্তা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। জনগণের নিরাপদ মাছের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নৌ পুলিশ ভবিষ্যতে আরও কঠোর নজরদারি এবং আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। সমাজের সমর্থন ও সহযোগিতা এই ধরনের অভিযানকে সফল করতে মূল ভূমিকা রাখবে।



