১৯ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক তেল বাজারে তেলের দাম আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বিষয়ক আলোচনার অচলাবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক তৎপরতা মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্যে তীব্র উত্থান ঘটিয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ফিউচার প্রতি ব্যারেল ২৪ সেন্ট বৃদ্ধি পেয়ে $70.59-এ লেনদেন হয়েছে, যা পূর্বের দামের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশের ঊর্ধ্বগতি। এই বৃদ্ধি গত সপ্তাহের শেষের তুলনায় উল্লেখযোগ্য, যেখানে দাম ইতিমধ্যে ৪ শতাংশের বেশি বাড়ে ছিল।
একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ২৮ সেন্ট বাড়ে $65.47-এ পৌঁছেছে। গত বুধবারও উভয় সূচকে ৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল, যা ৩০ জানুয়ারি পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা এবং তেল সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি মূলত দাম বাড়ার প্রধান কারণ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে কোনো বাধা দেখা দিলে, বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ প্রভাবিত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রুটগুলোর একটি, যেখানে জাহাজ চলাচল বন্ধ হলে তেল সরবরাহে তীব্র ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এই রুটে কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলে তেলের দামের অস্থিরতা তীব্রভাবে বাড়তে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারকে প্রভাবিত করবে।
নিসান সিকিউরিটিজের কৌশলবিদ হিরোয়ুকি কিকুকাওয়া বলেন, বর্তমান উত্তেজনা সত্ত্বেও পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র সংঘাতের সম্ভাবনা এখনো কম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তেলের দাম অতিরিক্ত বাড়তে না দেওয়ার জন্য কোনো সমর্থন প্রকাশ করেননি, ফলে কোনো সামরিক পদক্ষেপ সীমিত এবং স্বল্পমেয়াদী হতে পারে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, জেনেভায় ইরানের সঙ্গে আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তবে মূল বিষয়গুলোতে এখনও বড় পার্থক্য রয়ে গেছে। এই পার্থক্যগুলো সমাধান না হলে তেল বাজারের অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরান পরবর্তী আলোচনার জন্য কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরও বিশদ তথ্য উপস্থাপন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে একই সময়ে ইরান তাদের দক্ষিণাঞ্চলে রকেট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে, যা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ওই অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে, যা সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো তেল সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে তীব্র করেছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ইসরায়েলি হামলার শিকার হওয়া স্থানে ইরান নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করছে। এই নির্মাণ কাজগুলো তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রের উন্নয়ন নির্দেশ করে, যা তেল বাজারের গতিবিধিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
অধিকন্তু, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, গত মঙ্গলবার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রাখা হয়েছিল। এই অস্থায়ী বন্ধের ফলে তেল সরবরাহে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটেছে, যা দাম বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
বিশ্ব তেল বাজারের অস্থিরতা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নয়, ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে জেনেভায় অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনার ফলহীন সমাপ্তি থেকেও প্রভাবিত হয়েছে। এই দ্বিমুখী চাপ তেল মূল্যের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে প্রভাবিত করছে।



