ঢাকায় ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়া সরকারকে লক্ষ্য করে সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি (SDGs) আজ একটি সম্মেলন আয়োজন করে মাইক্রোইকোনমিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেছে। ‘নতুন সরকারের জন্য মাইক্রোইকোনমিক বেঞ্চমার্ক’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত এই ইভেন্টে প্ল্যাটফর্মের কনভেনর দেবপ্রিয়া ভট্টাচার্য এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর ডিস্টিঙ্গুইশড ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
প্ল্যাটফর্মের মতে, শাসনকালের প্রথম মাসেই তিনটি প্রধান বাধা মোকাবেলা করা জরুরি: মাইক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতার দুর্বলতা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের হ্রাস, এবং আর্থিক ফাঁক কমে যাওয়া। এই তিনটি দিকই দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে প্রভাবিত করতে পারে।
ম্যাক্রোইকোনমিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুদ্রাস্ফীতি প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জানুয়ারি মাসে ১২ মাসের গড় মুদ্রাস্ফীতি ৮.৭৭ শতাংশে পৌঁছায়, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৭ শতাংশের লক্ষ্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সময়ে, বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস পেয়েছে; আর্থিক বছর ২০২৫-এ ৪.৬ শতাংশ এবং আর্থিক বছর ২০২৬-এ জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ৭.৩ শতাংশ কমেছে।
খাদ্যদ্রব্যমূল্য কিছুটা শিথিল হয়েছে, তবে অখাদ্য দ্রব্যমূল্যের মূল্যবৃদ্ধি তেমন কমেনি। মজুরি বৃদ্ধিও নিম্নমানের, ফলে শ্রমিক শ্রেণির বাস্তব আয় হ্রাস পেয়েছে। মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীলতা কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, আর বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের উন্নতি দেশের পেমেন্ট ব্যালেন্সের চাপ কমিয়েছে।
তবে সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে তুলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ওপেন মার্কেট থেকে রিজার্ভ বাড়িয়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াচ্ছে, যা মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বেসরকারি বিনিয়োগের ঘাটতি কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে; আর্থিক বছর ২০২৫-এর প্রথমার্ধে প্রায় ২১ লক্ষ চাকরি হারিয়ে গেছে।
ফিসকাল স্পেসের সংকোচনও উল্লেখযোগ্য। সরকারি ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্বের বৃদ্ধি সীমিত থাকায় আর্থিক নীতি প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নতুন সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ইভেন্টে CPD এর রিসার্চ অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান তার উপস্থাপনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মুদ্রাস্ফীতি প্রবণতা, মুদ্রা সরবরাহের গতিবিধি এবং বেসরকারি সেক্টরের বিনিয়োগের অবস্থা বিশ্লেষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও খাদ্যদ্রব্যমূল্য কিছুটা কমেছে, অখাদ্য দ্রব্যমূল্যের দাম স্থিতিশীল নয় এবং মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ বাড়লেও, তা মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপেন মার্কেট অপারেশন থেকে এসেছে, যা মুদ্রা সরবরাহের অতিরিক্ত বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মুদ্রা নীতি ও আর্থিক নীতির সমন্বয় প্রয়োজন, যাতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হয়।
সিটিজেনস প্ল্যাটফর্মের কনভেনর দেবপ্রিয়া ভট্টাচার্য জোর দিয়ে বলেন, নতুন সরকারকে দ্রুত মাইক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বেসরকারি খাতের আস্থা ফিরে আসে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ফিসকাল স্পেসের সংকোচন মোকাবেলায় রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিতে হবে।
সারসংক্ষেপে, নতুন সরকারের জন্য মাইক্রোইকোনমিক চ্যালেঞ্জগুলো তিনটি মূল দিকের ওপর কেন্দ্রীভূত: মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রা সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পুনরুজ্জীবন, এবং আর্থিক নীতি ব্যবহারে ফিসকাল স্পেসের সম্প্রসারণ। এই তিনটি ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট নীতি ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীরগতি পাবে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের প্রবণতা বজায় রাখতে মুদ্রা নীতি কঠোর করার সম্ভাবনা উল্লেখ করছেন। একই সঙ্গে, বেসরকারি খাতের জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে কর নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো সহজতর করা জরুরি। ফিসকাল স্পেসের সংকোচন কমাতে রাজস্ব সংগ্রহের নতুন উপায়, যেমন করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং ট্যাক্স রিফর্ম, দীর্ঘমেয়াদে সহায়ক হতে পারে।
নতুন সরকার যদি এই তিনটি দিকেই সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরায় ত্বরান্বিত হতে পারে এবং জনসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।



