মুম্বাইয়ের কলাবা এলাকায় অবস্থিত একটি সংকীর্ণ গলির পাশে ছোট কংক্রিটের ঘরগুলোতে ধোয়াবাড়ি কর্মীরা কাপড় ধুয়ে শুকায়। ঐ গলির চারপাশে উজ্জ্বল রঙের শেল্টারগুলো টেট্রিসের টুকরো‑টুকরোর মতো স্তরে স্তরে সাজানো। এই জটিল গঠনের মাঝখানে একটি ছোট শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে, যেখানে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা মৌলিক গাণিতিক ও ভাষা শিক্ষা পায়, প্রথমবারের মতো অথবা স্কুল ছেড়ে ফিরে আসার সুযোগ পায়।
এই শিক্ষাকেন্দ্রের পরিচালনা রাবল নাগি নামের ৪৫ বছর বয়সী এক শিল্পী প্রতিষ্ঠা করা অলাভজনক সংস্থা রাবল নাগি আর্ট ফাউন্ডেশন (RNAF) করে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি মুম্বাইয়ের প্রান্তিক সম্প্রদায়ে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার কাজ চালিয়ে আসছেন। তার উদ্যোগে এখন পর্যন্ত ভারতের ১০০‑এর বেশি গ্রাম ও নগর এলাকায় ৮০০‑এর বেশি শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে, যেখানে লক্ষাধিক শিশুরা মৌলিক শিক্ষা পেয়েছে।
এ মাসের শুরুর দিকে রাবল নাগি গ্লোবাল টিচার প্রাইজের ১ কোটি ডলারের পুরস্কার গ্রহণ করেন। এই পুরস্কারটি ভার্কি ফাউন্ডেশন ও ইউনেস্কো যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে, যা শিক্ষাক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রাখে এমন শিক্ষকদের স্বীকৃতি দেয়। গ্লোবাল টিচার প্রাইজের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ১৩৯টি দেশের ৫,০০০টি আবেদন থেকে রাবল নাগি নির্বাচিত হয়েছেন।
রাবল নাগির শিক্ষার প্রতি আগ্রহের শিকড় প্রায় ত্রিশ বছর আগে, যখন একটি ছোট ছেলে তার মুম্বাইয়ের আর্ট কর্মশালায় প্রবেশ করে। শিশুটি স্লামের বাসিন্দা এবং স্কুলে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। এই তথ্য জানার পর রাবল নাগি সেই স্লামের দিকে গিয়ে স্থানীয় বাড়িগুলোকে রঙিন মুরাল দিয়ে সজ্জিত করার প্রস্তাব দেন।
মুরাল আঁকার সময় শিশুরা কাজের পাশে জড়ো হয়, এবং রাবল নাগি তাদেরকে গল্প শোনার প্রস্তাব দেন। শিশুরা উচ্ছ্বাসে “হ্যাঁ” বলে, ফলে তিনি বুঝতে পারেন যে শিক্ষার প্রতি তাদের স্বাভাবিক আগ্রহ রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা তাকে স্লামের মধ্যে একটি শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিতে প্রেরণা দেয়।
শিক্ষাকেন্দ্রের পাঠক্রমে মৌলিক গাণিতিক ধারণা, বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রাথমিক দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত। এখানে কোনো ফি নেওয়া হয় না, এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা পাঠদান ও পরিচালনায় সহায়তা করেন। ফলে বহু শিশু প্রথমবারের মতো বিদ্যালয়ের দরজা খুলে পায়, আবার যারা মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল তারা আবার শিক্ষার পথে ফিরে আসে।
রাবল নাগি ও তার দল এখন পর্যন্ত ৮০০‑এর বেশি শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ১.৫ লক্ষ শিশুকে মৌলিক শিক্ষা প্রদান করেছে বলে জানিয়েছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্লামের শিশুরা শুধু পড়াশোনায় নয়, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দক্ষতায়ও উন্নতি লাভ করেছে।
ভবিষ্যতে RNAF আরও ২০০টি নতুন শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে, বিশেষ করে মহিলাদের ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা চালু করবে। তাছাড়া, স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলে শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে।
আপনি যদি আপনার এলাকার কোনো দরিদ্র সম্প্রদায়ে শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে চান, তবে স্থানীয় অলাভজনক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে পারেন, অথবা শিক্ষাসামগ্রী দান করে সরাসরি সহায়তা করতে পারেন। ছোট ছোট উদ্যোগই সমাজের বৃহৎ পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে তোলে।



