স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত সোমবার জৈব নমুনায় মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ (ডোপ টেস্ট) বিধিমালা-২০২৬ জারি করে, যার মাধ্যমে ডোপ টেস্টে পজিটিভ ফলাফল পাওয়া ব্যক্তিকে সরকারী, আধা-সরকারি, স্থানীয় সরকার ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের যোগ্যতা থেকে বাদ দেওয়া হবে এবং ইতিমধ্যে চাকরিতে থাকলে শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা-২০১৮ অনুযায়ী তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে।
প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে উপসচিব মাহবুব আলম স্বাক্ষরিত ডোপ টেস্ট টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে; কমিটির চেয়ারম্যান হবেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদক অণুবিভাগের একজন অতিরিক্ত উপসচিব, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বা তাদের মনোনীত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের একজন অধ্যাপক, সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ (ডিআইজি), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল মেডিসিন সেন্টারের পরিচালক এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালকসহ নয়জন বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রয়োজন হলে তারা অতিরিক্ত সদস্যকে কো-অপ্ট করার অনুমতি পাবে।
বিধিমালার অধীনে সরকারি, আধা-সরকারি, স্থানীয় সরকার, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি সংস্থায় নিয়োগের সময় ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক হবে। কোনো প্রার্থী মাদক গ্রহণের সন্দেহে থাকলে অথবা তার সম্পর্কে কোনো অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা টেস্টের আবেদন করতে পারবে। একই নীতি চালক লাইসেন্সের প্রদান ও নবায়ন, নৌযান ও আকাশযান চালকের লাইসেন্স, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এবং বিদেশে ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক কর্মচারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
গাড়ি, মোটরসাইকেল, ট্রাক, বাস ইত্যাদি বিভিন্ন যানবাহনের চালকের ক্ষেত্রে, যদি কাজের সময় মাদক গ্রহণের সন্দেহ উঠে আসে, তবে ডোপ টেস্ট করা যাবে। নৌযান ও বিমান চালকের লাইসেন্স নবায়নের সময়ও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, যা নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে। এছাড়া, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রাপ্তি ও নবায়নের সময়ও মাদক টেস্ট বাধ্যতামূলক হবে, যা অস্ত্রের অপব্যবহার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিদেশে কাজ বা ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রেও ডোপ টেস্টের ফলাফলকে নিয়োগের শর্ত হিসেবে ধরা হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যদি মাদক সেবনের অভিযোগ বা সন্দেহ থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ টেস্টের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করতে পারবে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় মাদক সংক্রান্ত সমস্যার প্রাথমিক সনাক্তকরণ সম্ভব হবে।
বিধিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ডোপ টেস্টে পজিটিভ ফলাফল পাওয়া ব্যক্তিকে নিয়োগের যোগ্যতা থেকে বাদ দেওয়া হবে এবং ইতিমধ্যে চাকরিতে থাকলে শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা-২০১৮ অনুসারে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। মাদকাসক্তি নিশ্চিত হওয়ার পর চিকিৎসা নির্দেশনা মেনে না চললে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে, মাদক সমস্যার সমাধানে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রোগ্রামেও বাধ্যতামূলকতা যুক্ত হবে।
বিধিমালা যদিও সদ্য অনুমোদিত, তবে উল্লেখযোগ্য যে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), মেট্রো রেল, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ইতিমধ্যে কয়েক বছর ধরে ডোপ টেস্টকে বাধ্যতামূলক করে চলেছে। নতুন বিধিমালা এই প্র্যাকটিসকে সমগ্র সেক্টরে একীভূত করে, যাতে সকল প্রার্থীর উপর সমান মানদণ্ড প্রয়োগ করা যায়।
এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে টেস্টের মানদণ্ড, নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতি এবং ফলাফল বিশ্লেষণের প্রোটোকল নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। টেস্টের গোপনীয়তা রক্ষা এবং ফলাফলকে সঠিকভাবে রেকর্ড করার জন্য ডিজিটাল সিস্টেমের ব্যবহারও পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ডোপ টেস্ট বিধিমালা-২০২৬ প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার মাদক সংক্রান্ত সমস্যাকে কঠোরভাবে মোকাবেলা করার সংকল্প প্রকাশ করেছে এবং জনসাধারণের বিশ্বাস বাড়ানোর লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে, এই নীতি কর্মচারী ও প্রার্থীদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিধিমালার কার্যকরী তারিখ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরবর্তী সপ্তাহে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রকাশ করবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নতুন নিয়ম অনুসারে নিয়োগ প্রক্রিয়া, লাইসেন্স প্রদান ও পুনর্নবায়ন প্রক্রিয়া আপডেট করতে হবে এবং টেস্টের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, ডোপ টেস্টে পজিটিভ ফলাফল পাওয়া ব্যক্তির জন্য সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির অযোগ্যতা, শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে শাস্তি এবং চিকিৎসা না করলে অপরাধের ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যা মাদক নিয়ন্ত্রণে একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো গড়ে তুলবে।



