ইরান সরকার টেলিগ্রাম প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে জার্মানির রাষ্ট্রদূত অ্যাক্সেল ডিটমানকে মিউনিখে অনুষ্ঠিত ইরানবিরোধী সমাবেশের বিষয়ে ইরান সরকারের আপত্তি জানাতে তলব করেছে। এই তলবটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক অভ্যন্তরীণ বৈঠকে উপস্থাপিত হয়েছে, যদিও বৈঠকের সুনির্দিষ্ট তারিখ ও সময় প্রকাশ করা হয়নি। জার্মানির পররাষ্ট্র দপ্তর এখনো এই দাবির ওপর কোনো সরকারি মন্তব্য করেনি।
মিউনিখে গত শনিবার অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রায় দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা প্রকাশ করেছে। সমাবেশটি ইরানের প্রাক্তন শাসক রেজা শাহ পাহলভির সন্তান রেজা পাহলভির আহ্বানে সংগঠিত হয়েছিল এবং ইরানবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। সমাবেশের সময় নিরাপত্তা সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
জার্মানির ফ্রিড্রিকসবার্গে অবস্থিত এফডিপি দলের মারি-আগনেস স্ট্রাক-জিমারমান এবং সিডিইউর পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক আইনপ্রণেতা আরমিন লাশেটসহ কয়েকজন জার্মান রাজনীতিবিদ সমাবেশের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। তাদের সমর্থন ইরানবিরোধী প্রতিবাদকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দৃশ্যমান করে তুলেছে, যা ইরান সরকারের জন্য কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান সরকার এই সমাবেশকে তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে। তেলাভিভূমি ও পারস্য উপসাগরের কূটনৈতিক গতি-প্রকৃতির সঙ্গে তুলনা করে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, মিউনিখের সমাবেশ ইরানের আন্তর্জাতিক চিত্রকে প্রভাবিত করতে পারে এবং জার্মানির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উত্তেজনা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে, ইরান সরকার পূর্বে জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে দেশজুড়ে বিস্তৃত প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনকে নিন্দা করে, যেখানে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী সাত হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
ইরানের এই তলবের পর জার্মানির পররাষ্ট্র দপ্তর এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি, তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জার্মান সরকার বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা বলেন, জার্মানি যদি ইরানের আপত্তি উপেক্ষা করে সমাবেশের সমর্থন চালিয়ে যায়, তবে তা ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়াতে পারে, যার মধ্যে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা, কনসুলার সেবা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, ইরান সরকার জার্মানির এই ধরনের সমাবেশকে আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতিমালার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে ইরানের নাগরিকদের জার্মানিতে ভ্রমণ বা কাজের অনুমতি সংক্রান্ত কঠোর শর্ত আরোপের সম্ভাবনা উত্থাপন করতে পারে। বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করেন, মিউনিখের সমাবেশের পরবর্তী পর্যায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোতে ইরানবিরোধী প্রতিবাদ বাড়তে পারে, যা ইরান সরকারকে আরও কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারে।
ইরান সরকারের তলবের সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশ ইতিমধ্যে ইরানের মানবাধিকার রেকর্ডের ওপর সমালোচনা প্রকাশ করেছে, তবে সরাসরি জার্মানির কূটনৈতিক নীতি পরিবর্তনের কোনো সংকেত এখনো দেখা যায়নি। ভবিষ্যতে জার্মানির পররাষ্ট্র দপ্তর কীভাবে এই বিষয়টি পরিচালনা করবে, তা ইরানবিরোধী আন্দোলনের আন্তর্জাতিক সমর্থন ও জার্মানির কূটনৈতিক স্বার্থের ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করবে।
ইরান সরকার জার্মানির রাষ্ট্রদূতকে তলব করার মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রতি আঘাতের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। মিউনিখের সমাবেশের পরিপ্রেক্ষিতে জার্মানির কূটনৈতিক অবস্থান কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে ঘনিষ্ঠ নজরে থাকবে। এই প্রেক্ষাপটে, উভয় দেশের কূটনৈতিক সংলাপের পরবর্তী ধাপ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ইরানবিরোধী প্রতিবাদ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



