নতুন সরকার গঠন হওয়ার পরই আর্থিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিযুক্ত আহসান খান চৌধুরীকে বিস্তৃত কাজের তালিকা হাতে দেওয়া হয়েছে। আর্থিক সংস্কার, ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ তার তাত্ক্ষণিক দায়িত্ব।
মুদ্রাস্ফীতি, বিশেষ করে খাবারের মূল্যের ওঠানামা, দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের সরাসরি সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। রমজান মাসের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে মৌলিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, ফলে দাম বাড়ার প্রবণতা তীব্র হয়। জানুয়ারি মাসে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি বার্ষিক ভিত্তিতে ৮.৫৮ শতাংশে পৌঁছায়, যা পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি।
খাবারের দামের বৃদ্ধি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক; জানুয়ারি মাসে খাবার মুদ্রাস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশে বেড়েছে, যখন ডিসেম্বর মাসে এটি ৭.৭১ শতাংশে ছিল। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি সরকারকে কঠিন রাজনৈতিক অবস্থায় ফেলেছে, কারণ জনগণের আর্থিক নীতি সম্পর্কে আস্থা মূলত খাবারের মূল্যের ওপর নির্ভরশীল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান উল্লেখ করেছেন যে, ব্যবসায়িক সংস্থাগুলিকে অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধি বন্ধ করার স্পষ্ট সংকেত প্রয়োজন। এ জন্য সরবরাহের অবস্থা বিশ্লেষণ করে কঠোর নীতি নির্ধারণ করা উচিত। তিনি আরও বলেন, আর্থিক, বাণিজ্য ও গৃহ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাজ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন।
সেলিম রায়হান পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, নতুন সরকারের রাজনৈতিক “হানিমুন” সময় সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত সীমিত থাকতে পারে; তার পর জনগণের ধৈর্য কমে যাবে এবং দমনমূলক পদক্ষেপের চাহিদা বাড়বে। তাই সরকারকে দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
প্রধানমন্ত্রীর পদে আসা তারেক রহমানের নেতৃত্বে গৃহীত নীতি একটি দুর্বল অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের দিকে লক্ষ্য রাখে। দেশের আর্থিক অবস্থা এখনও বহিরাগত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) প্রোগ্রামের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ জানুয়ারি ২০২৩-এ IMF প্রোগ্রামে প্রবেশ করে, যখন বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে তীব্র হ্রাস দেখা গিয়েছিল। প্রোগ্রামের শর্তাবলী অনুসরণে সরকারকে নিয়মিত লক্ষ্য পূরণ করতে হয়, তবে লক্ষ্য না পূরণে ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে।
ইন্টারিম সরকার পূর্বে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার আশায় কিছু স্বস্তি পেতে চেয়েছিল, তবে ঋণদাতারা কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা দেখা দিলে ঋণ বিতরণে বিরতি আরোপ করা হয়েছে, যা অর্থনৈতিক প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করে।
এই পরিস্থিতিতে আহসান খান চৌধুরীর জন্য আর্থিক নীতি নির্ধারণে ত্বরান্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদ হার, কর কাঠামো এবং সরকারি ব্যয়ের সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকিং সেক্টরের স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাজারে তেল, গ্যাস এবং রপ্তানি পণ্যের দামের পরিবর্তনও মুদ্রাস্ফীতিতে প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি জ্বালানি খরচে প্রভাব ফেলে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়।
সরকারের আর্থিক নীতি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ঋণদাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক মসৃণ হতে পারে এবং IMF প্রোগ্রামের শর্ত পূরণে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, মূল্য স্থিতিশীলতা না বজায় রাখলে সামাজিক অশান্তি এবং রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, রমজান মাসের শেষের দিকে খাবারের চাহিদা শীর্ষে পৌঁছাবে, ফলে দাম আরও বাড়তে পারে। তাই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সময়মতো হস্তক্ষেপ করা জরুরি, যাতে বাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা না দেখা দেয়।
সারসংক্ষেপে, আহসান খান চৌধুরীর প্রথম মাসে আর্থিক সংস্কার, ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি, বিশেষ করে খাবারের দামের ওপর তীব্র নজর রাখতে হবে। এই চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করা হলে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত হবে।



