ঢাকা, ১৮ ফেব্রুয়ারি – অবকাঠামো উন্নয়নের নামে নেওয়া বিশাল প্রকল্পগুলোতে অতিমূল্যায়ন, দুর্নীতি এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থার প্রভাবের কারণে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ঋণ‑ঝুঁকির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা দল সতর্ক করেছে। গবেষণার ফলাফল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘সরকারি ঋণ ও সুশাসন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত হয়।
গবেষণাটি যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ একটি শিক্ষা‑গবেষণা প্রতিষ্ঠান, একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা এবং দেশের গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের যৌথ উদ্যোগে সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল, যা ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। ১৬ বছরের মধ্যে ঋণ পরিমাণে ৩৭৭ শতাংশের বিশাল বৃদ্ধি ঘটেছে, একই সঙ্গে সুদ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুশতাক এইচ খান বিশ্লেষণ করেন, ঋণ নেওয়া নিজে সমস্যার মূল নয়; বরং চুক্তির শর্তে সামান্য অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে বিশাল আর্থিক বোঝা সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ, বিদ্যুৎ ক্রয়ের দামে কয়েক সেন্টের অতিরিক্ত বৃদ্ধি ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত দায়ে রূপান্তরিত হতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সমস্যাটি কেবল ঋণের পরিমাণ নয়, বরং প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি।
গবেষণায় অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যর্থতাকে দুইটি ধরণে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে নির্মিত হলেও চুক্তিতে নির্ধারিত দাম বাস্তবের তুলনায় অতিরিক্ত উচ্চ। দ্বিতীয়ত, কিছু প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন উভয়ই ত্রুটিপূর্ণ, ফলে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন হয় না। উভয় ক্ষেত্রেই সরকারী ব্যয় বাড়ে এবং ঋণ সেবা করার ক্ষমতা হ্রাস পায়।
বিদ্যুৎ খাতকে গবেষণায় সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে স্থির সক্ষমতা চার্জ প্রায় ৩৮,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। এই চার্জের অর্থ হল, বিদ্যুৎ ব্যবহার হোক বা না হোক, সরকারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ চুক্তির ফলে সরকারকে প্রতি বছর প্রায় ৪.৯ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যাতে শেষ গ্রাহকের জন্য বিদ্যুৎ দামের বৃদ্ধি রোধ করা যায়। যদি এই ভর্তুকি বন্ধ করা হয়, তবে বিদ্যুৎ দামের বৃদ্ধি ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের মোট পরিশোধ ১১ গুণ, এবং সক্ষমতা চার্জ ২০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও উৎপাদন মাত্র চার গুণ বেড়েছে। ফলে, অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র জ্বালানি সংকটে অচল থাকলেও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতার কারণে সরকারকে অর্থ প্রদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এই অপ্রয়োজনীয় ব্যয় দেশের আর্থিক ভারকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
গবেষণায় শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের অভিজ্ঞতাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। শ্রীলঙ্কা উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ চুক্তি এবং ঋণ সেবার চাপের ফলে আর্থিক সংকটে পড়ে, যা দেশের অর্থনীতিকে গভীর মন্দার দিকে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একই ধরনের চুক্তি বজায় রাখলে অনুরূপ আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এইসব তথ্যের আলোকে বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করেন, নতুন অবকাঠামো প্রকল্পে চুক্তি নির্ধারণের সময় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং শক্তিশালী জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। পাশাপাশি, বিদ্যমান ঋণ চুক্তিগুলোর পুনর্মূল্যায়ন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
যদি এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত না হয়, তবে ঋণ পরিমাণের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের বোঝা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। বিশেষত, বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি এবং উচ্চমূল্যের চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে তুলবে, যা বিনিয়োগের পরিবেশকে অনুকূল না করে।
সারসংক্ষেপে, গবেষণাটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ঋণ গ্রহণের চেয়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাবই বাংলাদেশের আর্থিক ঝুঁকির মূল কারণ। অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে এই দিকগুলোকে শক্তিশালী করলে ঋণ‑ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনা কমে যাবে এবং টেকসই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পথ সুগম হবে।



