ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে বুধবার মেটা প্ল্যাটফর্মসের সিইও মার্ক জুকারবার্গ সামাজিক মিডিয়া শিশুদের ওপর আসক্তিকর প্রভাব তৈরি করে কিনা তা নির্ধারণের মামলায় উপস্থিত হন। মামলাটি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক নেটওয়ার্কের প্রভাব নিয়ে প্রথমবারের মতো জুরি সমক্ষে শোনা হচ্ছে। মূল বাদী K.G.M. (প্রারম্ভিক অক্ষর) এবং তার আইনজীবীরা মেটা, গুগল ইউটিউব এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মকে দায়ী করে দাবি করছেন যে এই সেবাগুলো শিশুদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করাতে উৎসাহিত করে।
মার্ক জুকারবার্গের নেতৃত্বে মেটা প্ল্যাটফর্মস, যা ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং মেটা (পূর্বে ফেসবুক) সহ একাধিক সেবা পরিচালনা করে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যবহারকারীর অভ্যাস নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। এই মামলায় জুকারবার্গের প্রথম জুরি উপস্থিতি হওয়ায় মিডিয়া ও আইনি বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মেটার আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে বাদীর সমস্যাগুলি তার জীবনের অন্যান্য কারণের ফল, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের সরাসরি ফল নয়।
বাধ্যতামূলকভাবে বাদী K.G.M., যাকে ক্যালি নামেও পরিচিত, শৈশব থেকেই ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউব ব্যবহার করে আসছে। তার আইনজীবীরা উল্লেখ করেন যে তিনি মাত্র নয় বা দশ বছর বয়সে এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে সক্রিয় ছিলেন এবং এখন তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে বলে দাবি করছেন। কোর্টরুমে উপস্থিত ক্যালি সরাসরি জুকারবার্গের মুখোমুখি বসে ছিলেন, যেখানে উভয়ের মাঝখানে নিরাপত্তা কর্মী ও সহকর্মীরা ছিলেন।
মামলায় গুগল ইউটিউবও অভিযুক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত, আর টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের নামও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাট মামলাটি শুরু হওয়ার আগে সমঝোতা করে, যার শর্তাবলি প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। এই সমঝোতা অন্যান্য সামাজিক নেটওয়ার্কের জন্য সম্ভাব্য রেফারেন্স তৈরি করেছে, কারণ একই ধরণের অভিযোগে বহু কোম্পানি এখনো আদালতে মুখোমুখি।
কোর্টরুমে ক্যালি এবং তার পরিবার ছাড়াও কিছু শোকাহত পিতামাতাও উপস্থিত ছিলেন, যারা নিজেদের সন্তানদের অনলাইন আসক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জুকারবার্গ নিরাপত্তা দলের সঙ্গে প্রবেশ করেন এবং তার সঙ্গে কয়েকজন মেটা কর্মীও ছিলেন। উপস্থিতি উভয় পক্ষের জন্যই উচ্চ চাপের মুহূর্ত ছিল, কারণ মামলাটি সামাজিক মিডিয়া শিল্পের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বাধ্যতামূলকভাবে ক্যালির আইনজীবী মার্ক ল্যানিয়ার জুকারবার্গকে প্রশ্ন করেন, কীভাবে মেটা ব্যবহারকারীর সময় বাড়ানোর লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। ল্যানিয়ার জুকারবার্গের হাতে থাকা ইমেইলগুলো তুলে ধরেন, যেখানে ২০১৫ সালে জুকারবার্গ তার সহকর্মীদের জানিয়েছিলেন যে বছরের লক্ষ্য হল ব্যবহার সময়কে ১২ শতাংশ বাড়ানো এবং কিশোর ব্যবহার হ্রাসের প্রবণতা উল্টে দেওয়া।
ইমেইলে উল্লেখ করা ছিল যে মেটা প্ল্যাটফর্মের জন্য ব্যবহার সময়কে প্রধান মেট্রিক হিসেবে ধরা হয়েছে এবং তা বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে। ল্যানিয়ার জোর দিয়ে বলেন যে এই ইমেইলগুলো তখনই লেখা হয়েছিল, যখন ক্যালি মাত্র নয় বা দশ বছর বয়সী ছিলেন এবং ইতিমধ্যে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করছিলেন। এই তথ্যগুলো বাদীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখায় যে কোম্পানি ছোট বয়সের ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছিল।
জুকারবার্গ আদালতে স্বীকার করেন যে কোম্পানির প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি কর্মীদের ব্যবহার সময় বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তবে তিনি যুক্তি দেন যে সেই সময়ের লক্ষ্যগুলো বর্তমান নীতি ও ব্যবহারকারীর সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং কোম্পানি এখন ব্যবহারকারীর কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই স্বীকারোক্তি মামলার মূল বিষয়কে স্পষ্ট করে, যেখানে অতীতের লক্ষ্য ও বর্তমান দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।
এই মামলাটি সামাজিক মিডিয়া শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এর ফলাফল ভবিষ্যতে অনুরূপ বহু মামলা এবং নিয়ন্ত্রক নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। মেটা, গুগল ইউটিউব এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের ওপর আরোপিত দায়িত্বের মাত্রা নির্ধারণে আদালতের রায় নির্ধারক হবে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে যদি জুরি মেটার কার্যক্রমকে অবৈধ বলে রায় দেয়, তবে তা শিল্পের ব্যবসায়িক মডেল ও ব্যবহারকারী ডেটা পরিচালনার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
মামলার অগ্রগতি এখনও চলমান, এবং উভয় পক্ষই পরবর্তী সেশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ক্যালি এবং তার পরিবার আদালতে উপস্থিত থেকে তাদের দাবির সমর্থনে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছেন, আর মেটা প্ল্যাটফর্মসের প্রতিনিধিরা কোম্পানির নীতি ও ব্যবহারকারীর সুরক্ষা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার এবং শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে জনমত ও নীতি নির্ধারণে নতুন আলোচনার সূচনা হবে।



