লুইসিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকরা জানিয়েছেন যে, মাছের পাখনা ও স্যালাম্যান্ডারের অঙ্গ পুনর্গঠনে একই ধরনের জেনেটিক ও কোষীয় প্রক্রিয়া কাজ করে। এই ফলাফলটি জানুয়ারি ২২ তারিখে নেচার কমিউনিকেশনস জারিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং ভের্টিব্রেটের মধ্যে পুনর্জন্মের উত্স সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করে।
অধ্যয়নের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন ইগর শ্নাইডার, যিনি বাটন রুজে অবস্থিত লুইসিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ইভোলিউশনাল ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজি নিয়ে কাজ করেন। তিনি সেনেগাল বিচির (Polypterus senegalus) নামের একটি প্রাচীন মাছের উপর গবেষণা কেন্দ্রীভূত করেন, যা সম্পূর্ণ পাখনা হারালে তা পুনরায় গঠন করতে সক্ষম। এই প্রজাতিটি আধুনিক হাড়যুক্ত মাছের পূর্বপুরুষের কাছাকাছি বিবেচিত হয়, তাই এটিকে “লিভিং ফসিল” বলা হয়।
বিচিরের পাখনা কেটে ফেলা হয় এবং ক্ষতস্থলে এক, তিন ও সাত দিনের মধ্যে জিনের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ক্ষতস্থলে উপস্থিত কোষের ধরণ ও তাদের সক্রিয়তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। একই ধরনের তথ্যকে অক্ষোলটল (একটি স্যালাম্যান্ডার) ও জেব্রাফিশের (একটি আধুনিক হাড়যুক্ত মাছ) সঙ্গে তুলনা করা হয়।
তিনটি প্রজাতিই ক্ষতস্থলে ইমিউন কোষের দ্রুত প্রবাহ দেখায়। প্রথমে এই কোষগুলো ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসের কাজ করে, যা মানুষের মতোই ক্ষতস্থলে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তবে বিচির ও অক্ষোলটলে ইমিউন সিস্টেম দ্রুতই তার কৌশল পরিবর্তন করে, অতিরিক্ত প্রদাহ কমিয়ে দেয় যাতে দাগ গঠনের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
জেব্রাফিশে একই পর্যায়ে ইমিউন কোষের উপস্থিতি সত্ত্বেও, গবেষণায় দেখা যায় যে এই প্রজাতিতে প্রদাহের দমন কম তীব্র, ফলে দাগ গঠনের ঝুঁকি বেশি। এই পার্থক্যটি ইঙ্গিত করে যে, পাখনা ও অঙ্গের পুনর্জন্মে ইমিউন সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এবং এই নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্মতা প্রজাতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
গবেষণায় ব্যবহৃত জিন এক্সপ্রেশন বিশ্লেষণ দেখায় যে, পুনর্জন্মের প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট সিগন্যালিং পথ সক্রিয় হয়, যা কোষের বিভাজন ও পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করে। এই পথগুলোতে থাকা জিনগুলো উভয় মাছ ও স্যালাম্যান্ডারে সমানভাবে প্রকাশ পায়, যা নির্দেশ করে যে, এই জেনেটিক টুলকিটটি ভের্টিব্রেটের প্রাচীন সময় থেকে সংরক্ষিত।
বিচিরের পুনর্জন্ম ক্ষমতা, তার প্রাচীন বংশগত অবস্থান এবং জেনেটিক সমতা একসাথে দেখায় যে, অঙ্গ পুনর্গঠনের ক্ষমতা সম্ভবত ভের্টিব্রেটের প্রাথমিক বিবর্তনীয় পর্যায়ে উপস্থিত ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে অনেক প্রজাতিতে হারিয়ে গিয়েছে। এই গবেষণা সেই সময়ের বিবর্তনীয় চিত্রকে স্পষ্ট করতে সহায়তা করে।
অক্ষোলটল, যা তার অঙ্গ পুনর্জন্মের জন্য পরিচিত, এবং জেব্রাফিশ, যা পাখনার হাড়ীয় অংশ পুনর্গঠন করে, উভয়ের তুলনায় বিচিরের পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত এবং দ্রুত। ফলে, বিচিরকে গবেষণার মডেল হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে মানবিক অঙ্গ পুনর্গঠন গবেষণার জন্য নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
এই গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত করে যে, মানবদেহে যদি একই ধরনের ইমিউন নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া সক্রিয় করা যায়, তবে অঙ্গের ক্ষতি থেকে পুনরুদ্ধার সম্ভব হতে পারে। তবে বর্তমানে মানবের ইমিউন সিস্টেমের জটিলতা ও দাগ গঠনের প্রবণতা ভিন্ন, তাই সরাসরি প্রয়োগের আগে আরও বিশদ গবেষণা প্রয়োজন।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ফলাফলকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে, কারণ এটি পুনর্জন্মের জেনেটিক ভিত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয় এবং ভবিষ্যতে পুনর্জন্মমূলক থেরাপির বিকাশে নতুন পথ উন্মুক্ত করতে পারে।
গবেষকরা পরবর্তী ধাপে এই জেনেটিক টুলকিটের নির্দিষ্ট মেকানিজম বিশ্লেষণ করে, কীভাবে ইমিউন সিগন্যালিংকে নিয়ন্ত্রণ করে দাগ গঠন রোধ করা যায় তা জানার পরিকল্পনা করছেন। এই ধরনের গবেষণা দীর্ঘমেয়াদে মানবিক অঙ্গ পুনর্গঠন বা টিস্যু রিজেনারেশন প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
আপনি কি মনে করেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের জেনেটিক ও ইমিউন নিয়ন্ত্রণের জ্ঞান ব্যবহার করে মানবদেহে অঙ্গ পুনর্জন্ম সম্ভব হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা এখনই কাজ শুরু করেছেন।



