ইরানের প্রধান কূটনীতিক আব্বাস আরাঘচি বুধবার জানিয়েছেন যে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি প্রাথমিক কাঠামো প্রস্তুত করছে। একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি সেক্রেটারি ক্রিস রাইট বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা “একভাবে হোক না কেন” থামাবে। এই দুই দেশের পদক্ষেপের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্বেগ এবং পারমাণবিক সংকট এড়ানোর প্রচেষ্টা রয়েছে।
আর্বাঘচি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, তেহরান ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু “নির্দেশক নীতি” নিয়ে সমঝোতা করেছে এবং এখন একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভিপি জেডি ভ্যান্সের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ইরান এখনও সব “লাল রেখা” স্বীকার করেনি, তবে আলোচনার ভিত্তি গড়ে তোলার কাজ চলছে।
এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করার পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ও বিমানবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ছে, যা ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রামকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবুও দু’দেশের কূটনীতিকরা সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
গত বছর জুনে ইসরায়েল ইরানের ওপর আক্রমণ চালানোর পর ১২ দিনের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে দুই পক্ষের আলোচনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। তবে ওমানের মধ্যস্থতায় গেনেভা শহরে মঙ্গলবার আবার দ্বিতীয় রাউন্ডের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই সেশনে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা পূর্ববর্তী সংঘাতের পরিণতি এবং পারমাণবিক বিষয়ের ওপর পুনরায় মতবিনিময় করেন।
আর্বাঘচি উল্লেখ করেন, তেহরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কিছু মৌলিক নীতি নিয়ে সমঝোতা হয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিপি ভ্যান্সের মতে ইরান এখনও সব শর্ত পূরণ করেনি। এই পার্থক্য ভবিষ্যৎ আলোচনার গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
বুধবার আরাঘচি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গে টেলিফোনিক আলোচনা করেন। কথোপকথনে তিনি ইরানের পারমাণবিক নীতি নিয়ে একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত কাঠামো তৈরির গুরুত্ব তুলে ধরেন, যা ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি হবে। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, এই কাঠামোটি উভয় পক্ষের স্বার্থকে সমন্বয় করে পারমাণবিক উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হবে।
একই দিন পারিসে আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সির (IEA) সেশনের পাশে ক্রিস রাইট প্রেসকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে রোধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি উল্লেখ করেন, পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট এবং তা “অগ্রহণযোগ্য”। রাইটের এই মন্তব্য ইরানের পারমাণবিক পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে পুনরায় তীব্র করেছে।
বুধবার ভিয়েনায় ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি রেজা নাজাফি গ্রোসি এবং চীন ও রাশিয়ার দূতাবাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি যৌথ বৈঠক করেন। এই বৈঠকে তারা আসন্ন IAEA বোর্ড অফ গভর্নর্স সেশনের প্রস্তুতি এবং ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রামের সাম্প্রতিক উন্নয়ন নিয়ে মতবিনিময় করেন। ইরান মিশনের এক্স পোস্টে উল্লেখ করা হয়, এই আলোচনা পারমাণবিক বিষয়ের ওপর আন্তর্জাতিক সমঝোতা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
ইরান সম্প্রতি IAEA সঙ্গে কিছু সহযোগিতা স্থগিত করেছে এবং সংস্থার পরিদর্শকদের ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণকৃত সাইটে প্রবেশের অনুমতি সীমিত করেছে। তেহরান IAEA-কে পক্ষপাতদুষ্ট এবং পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহে ব্যর্থ বলে অভিযুক্ত করেছে। এই পদক্ষেপ পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি তেহরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কাঠামোগত আলোচনার অগ্রগতি হয়, তবে পারমাণবিক সংকটের ঝুঁকি হ্রাস পেতে পারে এবং সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কমে যাবে। তবে উভয় পক্ষের শর্তাবলীর পার্থক্য এবং IAEA-র সঙ্গে চলমান বিরোধ ভবিষ্যৎ আলোচনার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। পরবর্তী সপ্তাহে গেনেভায় সম্ভাব্য তৃতীয় রাউন্ডের আলোচনা এবং IAEA বোর্ডের সিদ্ধান্তের ফলাফল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের দিকনির্দেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



