বেরলিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে উপস্থাপিত নতুন জার্মান চলচ্চিত্র ‘হোম স্টোরিজ’ (ইংরেজি শিরোনাম) দর্শকদের সামনে এসেছে। লেখক‑নির্দেশক ইভা ট্রোবিশের এই কাজটি ১৬ বছর বয়সী লিয়া (ফ্রিডা হর্নেম্যান) নামের কিশোরীর ট্যালেন্ট শো‑এর সুযোগে তার নিজস্ব পরিচয় ও পরিবারকে কীভাবে উপস্থাপন করবে তা নিয়ে গড়ে ওঠা অন্তর্দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। চলচ্চিত্রটি প্রায় দুই ঘণ্টা দীর্ঘ, প্রধান চরিত্রে ম্যাক্স রিমেল্ট, ইভা লেবাউ, রাহেল ওহম, পিটার রেনে লুডিক, গিনা হেনকেল এবং ফ্লোরিয়ান গাইসেলম্যানও অংশগ্রহণ করেছেন।
লিয়া একটি জাতীয় টেলিভিশন ট্যালেন্ট শো‑এ নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের এবং তার পূর্বপুরুষদের জীবনকে পরিষ্কার‑সুন্দর রূপে উপস্থাপন করার চাপের মুখোমুখি হয়। তার এই দ্বন্দ্বই ছবির মূল কাঠামো, যেখানে একাধিক প্রজন্মের চরিত্রের মাধ্যমে পূর্ব জার্মানির ছোট শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রঙিন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ট্রোবিশের পূর্বের কাজ ‘অল ইজ ওয়েল’ এবং ‘ইভো’ এর তুলনায় ‘হোম স্টোরিজ’ আরও জটিল ও বহুমুখী রূপ ধারণ করেছে।
চলচ্চিত্রের বর্ণনা বাস্তববাদী শৈলীতে গড়ে উঠেছে, যা আধুনিক জার্মান পরিচয়ের বৈপরীত্য ও জটিলতাকে সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করে। যদিও গল্পের গতি কখনো কখনো বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে, তবু এটি দর্শকের কাছে একটি চিন্তাশীল অভিজ্ঞতা প্রদান করে। বিশেষ করে স্থানীয় দর্শকরা শহরের ঐতিহাসিক পটভূমি ও সাংস্কৃতিক সূক্ষ্মতা সম্পর্কে বেশি সংবেদনশীল হতে পারেন।
‘হোম স্টোরিজ’ ট্যালেন্ট শো‑এর জনপ্রিয়তা ও তার সামাজিক প্রভাবের ওপরও আলোকপাত করে। ২০১০-এর দশকে ট্যালেন্ট শো গুলো সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের আকর্ষণ কমে যাওয়া দেখা যায়। এই ধারা অনুসরণ করে চলচ্চিত্রটি দেখায় কীভাবে এমন শো গুলো প্রায়শই জাতীয় গর্বের সূক্ষ্ম রূপে রূপান্তরিত হয়, যেখানে স্থানীয় নায়কদের গল্পকে বৃহত্তর জাতীয় বর্ণনায় গাঁথা হয়।
চিত্রনাট্যটি ট্যালেন্ট শো‑এর কাঠামোকে এক ধরণের আধুনিক মিথের সঙ্গে তুলনা করে, যেখানে প্রতিযোগীকে তার নিজস্ব ‘হোম স্টোরি’—অর্থাৎ তার জন্মস্থান ও পারিবারিক পটভূমি—উন্মোচন করতে হয়। লিয়ার ক্ষেত্রে, এই প্রকাশের প্রক্রিয়া তার আত্মপরিচয়কে পুনর্গঠন করার একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে, যা তার পরিবার ও শহরের সঙ্গে তার সম্পর্ককে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখায়।
চলচ্চিত্রের দৃশ্যাবলি পূর্ব জার্মানির ছোট শহরের রাস্তায় শুট করা হয়েছে, যেখানে পুরনো ইটের বাড়ি, স্থানীয় বাজার এবং ঐতিহ্যবাহী কাঠের গির্জা দেখা যায়। এই ভিজ্যুয়াল উপাদানগুলো গল্পের বাস্তবতা বাড়িয়ে দেয় এবং দর্শকের মধ্যে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি একধরনের পরিচিতি জাগিয়ে তোলে।
শুটিংয়ের সময় ব্যবহৃত প্রাকৃতিক আলো ও সুনির্দিষ্ট ক্যামেরা কোণগুলো চরিত্রের অভ্যন্তরীণ অশান্তিকে বহিরাগত পরিবেশের সঙ্গে মেলায়। ফলে লিয়ার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বটি শহরের শীতল বাতাসের সঙ্গে একত্রে প্রকাশ পায়, যা দর্শকের কাছে গভীর আবেগময় প্রভাব ফেলে।
‘হোম স্টোরিজ’ এর সঙ্গীতও গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সাজানো হয়েছে। জার্মান ঐতিহ্যবাহী সুরের সঙ্গে আধুনিক ইলেকট্রনিক রিদমের মিশ্রণ চলচ্চিত্রের মেজাজকে সমৃদ্ধ করে এবং ট্যালেন্ট শো‑এর উচ্ছ্বাস ও ব্যক্তিগত আত্মসমীক্ষার মধ্যে সেতু গড়ে তোলে।
চলচ্চিত্রের সময়কাল প্রায় এক ঘণ্টা ছাব্বিশ মিনিট, যা দর্শকদের জন্য যথেষ্ট সময় দেয় চরিত্রগুলোর বিকাশ পর্যবেক্ষণ করার। তবে কিছু সমালোচক মনে করেন, গল্পের গঠন কখনো কখনো অতিরিক্ত বিস্তৃত হয়ে যায়, ফলে মূল থিমের দিকে মনোযোগ হারিয়ে যায়। তবু এই বিস্তৃতি চলচ্চিত্রকে একধরনের সিরিজের প্রথম কয়েকটি পর্বের মতো অনুভব করায়, যা শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হয় না।
‘হোম স্টোরিজ’ এর প্রকাশনা সময়ে, জার্মান চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান প্রবণতা ও ট্যালেন্ট শো‑এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের চলচ্চিত্রগুলো ট্যালেন্ট শো‑এর মাধ্যমে গড়ে ওঠা জাতীয় পরিচয়ের মিথকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করে।
বেরলিন ফেস্টিভ্যালে চলচ্চিত্রটি প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মনোযোগ পেয়েছে। যদিও এখনও কোনো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে সিরিজের রূপে রূপান্তরিত হয়নি, তবে এর থিম ও কাঠামো ভবিষ্যতে টেলিভিশন সিরিজের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
সারসংক্ষেপে, ‘হোম স্টোরিজ’ একটি বহুমাত্রিক পারিবারিক চিত্র তুলে ধরে, যেখানে ট্যালেন্ট শো‑এর পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যক্তিগত আত্মপরিচয়ের সংঘর্ষের মাধ্যমে আধুনিক জার্মান সমাজের জটিলতা প্রকাশ পায়। চলচ্চিত্রটি যদিও কিছু ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে, তবু তার গভীর মানবিক দিক ও স্থানীয় রঙিন দৃশ্যাবলি দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং জার্মান চলচ্চিত্রের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।



