গাজা উপত্যকায় রমজান মাসের সূচনা ঘটেছে, যদিও ১০ অক্টোবর ২০২৩ থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। ৫২ বছর বয়সী মাইসুন আল‑বারবারাউই, যাকে স্থানীয়রা উম্মে মোহাম্মদ নামে চেনে, তার দুই সন্তানসহ একটি ত্রাণ শিবিরে রমজানের প্রথম দিন উদযাপন করছেন। তিনি ৯ বছর বয়সী পুত্র হাসানের জন্য একটি ছোট লণ্ঠন কিনে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলেছেন, যদিও তার আর্থিক সামর্থ্য সীমিত।
মাইসুনের মতে, রমজানের এই প্রথম দিনটি গত দুই বছরের শোকের পর সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, “শিশুদের মুখে হাসি দেখা বড় আশীর্বাদ, যদিও আমাদের ঘরবাড়ি ও প্রিয়জনের ক্ষতি অপরিবর্তনীয়।” ত্রাণ শিবিরের আশেপাশে এখনও ইসরায়েলি ড্রোনের গুলির চিহ্ন দেখা যায়, এবং মাঝে মাঝে আর্টিলারির গর্জন শোনা যায়, তবে আগের তীব্র সংঘাতের তুলনায় হুমকি কমে এসেছে।
গত বছর রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহে, ১৯ মার্চ, ইসরায়েলি আক্রমণে গাজার সীমান্ত বন্ধ হয়ে ত্রাণের প্রবাহ থেমে যায়, ফলে তীব্র খাদ্য সংকট এবং দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হয়। মাইসুন স্মরণ করেন, “আমার ছোট ছেলেটি খাবারের অভাবে প্রার্থনা করত, যেন ক্ষুধা তাকে না গ্রাস করে।” এই অভিজ্ঞতা এখনও গাজার বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের কারণ, এবং অনেক পরিবার এখন অল্প পরিমাণে আটা ও খাবার সংরক্ষণে মনোযোগ দিচ্ছে।
বৈশ্বিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি যদিও তুলনামূলকভাবে শান্ত, তবু সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। যুক্তরাষ্ট্র, মিশর ও কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মধ্যস্থতাকারীরা এই বিরতি বজায় রাখতে চাপ দিচ্ছে, এবং জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা দলগুলো গাজার দরিদ্র এলাকায় ত্রাণ বিতরণে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা রমজানকে মানবিক সহায়তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হিসেবে দেখছেন, কারণ ধর্মীয় ছুটির সময়ে নিরাপদ পরিবহন ও বিতরণ ব্যবস্থা সহজতর হয়।
গাজার ত্রাণ শিবিরে আরেকটি পরিবার, হানান আল‑আত্তার, ১৬ সদস্যের সঙ্গে দেইর আল‑বালাহতে একটি তাঁবুতে বসবাস করছেন। গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে তিনি গত দুই বছর ধরে খোলা আগুনে খাবার রান্না করছেন। হানান জানান, “দুর্ভাগ্যবশত আমরা এখনও মৌলিক জ্বালানির অভাবে ভুগছি, যদিও ত্রাণ সংস্থা কিছু পরিমাণে গ্যাস সরবরাহের চেষ্টা করছে।” তার পরিবারের পরিস্থিতি গাজার বৃহত্তর মানবিক সংকটের একটি উদাহরণ, যেখানে বিদ্যুৎ, পানি ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি দৈনন্দিন জীবনে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা রমজান মাসকে গাজার জন্য একটি পরীক্ষার সময় হিসেবে উল্লেখ করছেন। তারা বলেন, “যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব এবং ত্রাণের প্রবাহের ধারাবাহিকতা রমজানের শেষের দিকে নির্ধারিত ইদ‑উল‑ফিতরের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।” ইদ‑উল‑ফিতর, যা রমজানের শেষ দিন, গাজার বাসিন্দাদের জন্য আশা ও পুনর্গঠনের একটি সূচক হতে পারে, যদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকে।
গাজার বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল। মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি গাজার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়ে ত্রাণের নিরাপদ প্রবেশ নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে, কাতার আন্তর্জাতিক তহবিলের মাধ্যমে গাজার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ত্বরান্বিত সহায়তা প্রদান করছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতও গাজার মানবিক সংকটের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এবং ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
গাজা শিবিরের বাসিন্দারা রমজানের এই প্রথম দিনকে একদিকে আশা, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার মিশ্রণ হিসেবে অনুভব করছেন। মাইসুনের মতো বহু মা সন্তানদের জন্য মৌলিক খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছেন, আর হানান পরিবারের মতো বড় পরিবারগুলো দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ত্রাণ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের সাফল্যই গাজার রমজানকে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করে ইদ‑উল‑ফিতরে পৌঁছাতে সক্ষম হবে কিনা, তা নির্ধারণ করবে।
গাজায় রমজান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, মানবিক সহায়তার চাহিদা বাড়ছে এবং যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্বের ওপর আন্তর্জাতিক নজর তীব্র হয়েছে। গাজার বাসিন্দাদের জন্য এই পবিত্র মাসটি কেবল ধর্মীয় উপবাস নয়, বরং বেঁচে থাকার এবং আশা পুনর্নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।



