বেরলিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক ত্রিশা টাটল গত সপ্তাহে একাধিক সংকটের মুখে পড়েছেন। ৭২তম বেরলিনালের সূচনা ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে, টাটলকে ধারাবাহিকভাবে সামাজিক মিডিয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সামলাতে হয়েছে।
প্রথম দিনই বিষয়টি তীব্র হয়ে ওঠে। জুরি সভাপতি উইম ওয়েন্ডারসের একটি মন্তব্য, যেখানে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন, তা অনলাইন আলোচনায় উগ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই মন্তব্যের পরপরই উৎসবের প্রথম প্রেস কনফারেন্সে তীব্র বিতর্কের সঞ্চার হয়।
প্রেস কনফারেন্সগুলোতে চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো ধারাবাহিকভাবে উঠে আসে। অনেক পরিচালককে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, যা তাদের কাজের মূল বিষয়ের থেকে বিচ্যুত। এই পরিস্থিতি টাটলকে ক্রমাগত ব্যাখ্যা ও সমাধান প্রদান করতে বাধ্য করে।
মঙ্গলবারের দিকে বিষয়টি আরও তীব্র হয়। ৮১ জন প্রাক্তন বেরলিনালের অংশগ্রহণকারী—যার মধ্যে টিল্ডা সুইন্টন, হাভিয়ের বার্ডেম, তাতিয়ানা মাসলনি এবং অ্যাডাম ম্যাককে অন্তর্ভুক্ত—একটি উন্মুক্ত চিঠি স্বাক্ষর করেন। চিঠিতে তারা বেরলিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবকে ইসরায়েল-গাজা সংঘর্ষে ইসরায়েলীয় নৃশংসতা ও জার্মান সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে সমালোচনা করেন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উৎসবটি ইসরায়েল বিরোধী শিল্পীদের দমন করছে এবং গাজা সংঘাতে ইসরায়েলীয় সামরিক কার্যক্রমের বিরোধিতা করা শিল্পীদের কণ্ঠস্বরকে দমন করছে। এই অভিযোগগুলোকে উৎসবের নীতিমালা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটি নতুন স্তরে নিয়ে যায়।
বেরলিনে পূর্বে একই ধরনের অভিযোগ উঠে আসা অস্বাভাবিক নয়। ২০২৪ সালে, প্রো-প্যালেস্টাইন কর্মীরা উৎসবকে গাজা সংঘাতে ইসরায়েলীয় সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ার জন্য সমালোচনা করে। তারা একই সঙ্গে উৎসবকে প্রো-প্যালেস্টাইন কণ্ঠস্বর দমন করার অভিযোগও তুলেছিল।
টাটল প্রথম বছরের নেতৃত্বে (২০২৩) উৎসবটি তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত হয়েছিল। তবে এই বছর, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামাজিক মিডিয়ার চাপের কারণে বিষয়গুলো দ্রুত বাড়িয়ে ওঠে।
উৎসবের চলচ্চিত্রগুলোকে নিয়ে সমালোচকরা ইতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছে। হলিউড রিপোর্টার ‘এ প্রেয়ার ফর দ্য ডাইং’ ও ‘কুইন এট সি’ চলচ্চিত্রের প্রশংসা করে, যা প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে বিশেষ মনোযোগ পেয়েছে।
তবে চলচ্চিত্রের গুণমানের চেয়ে বিতর্কই বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে। টাটলকে এখনো এই বিতর্কের সমাধান ও উৎসবের স্বচ্ছতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
টাটল এই পরিস্থিতি নিয়ে একটি আলোচনায় তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, উৎসবের মূল লক্ষ্য হল শিল্পের স্বাধীনতা রক্ষা করা, তবে একই সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বের প্রতিও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান যে, চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরকে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজ করার অধিকার রয়েছে, তবে উৎসবের মঞ্চে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি কিছু শিল্পী ও সমালোচকের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছে, আবার অন্যদের কাছ থেকে সমালোচনা হয়েছে।
বেরলিন শহরের সাংস্কৃতিক পরিবেশে এই ধরনের বিতর্ক নতুন নয়, তবে সামাজিক মিডিয়ার দ্রুত বিস্তার ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা বিষয়গুলোকে দ্রুত বাড়িয়ে তুলেছে। টাটলকে এখনো এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, যাতে উৎসবের সুনাম ও শিল্পীর স্বাধীনতা উভয়ই রক্ষা পায়।
উৎসবের পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে কীভাবে এই বিতর্ক সমাধান হবে, তা শিল্প জগতের নজরে থাকবে। টাটল ও তার দলকে এখনো স্পষ্ট নীতি নির্ধারণের পাশাপাশি, শিল্পী ও দর্শকদের সঙ্গে সংলাপ বজায় রাখতে হবে।
বেরলিনালের এই বছরকার চ্যালেঞ্জগুলো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ভবিষ্যৎ গঠনেও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিষয়বস্তু ও শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনায়।



