গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর থেকে গণহত্যার তথ্য গোপন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আইনি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এই অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বুধবার দুপুরে জানিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন, উভয়কে ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে তথ্য লুকানোর নির্দেশ দেওয়া মূল অপরাধের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। মামলাটি বাংলাদেশের আইসিটি মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের জুলাই‑অগাস্ট মাসে নেওয়া সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সজীব ওয়াজেদ জয়, যিনি শীঘ্রই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে, তখন আইসিটি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। জুনাইদ আহমেদ পলক, যিনি পূর্বে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী পদে ছিলেন, তার সঙ্গে সমন্বয় করে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের আদেশ জারি করা হয়। উভয়কে এই কাজের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং গণহত্যার তথ্য লুকানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদের ওপর আরোপ করা হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তি হল, ইন্টারনেট বন্ধের ফলে দেশের বাইরে থেকে ঘটনার সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে গিয়েছিল।
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আজকের সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় প্রমাণ সংগ্রহের জন্য প্রাথমিক বক্তব্য দাখিল করেছে। তিনি আরও জানান, উক্ত প্রমাণের মধ্যে ইন্টারনেট বন্ধের সময়সূচি, আদেশের কপি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগাযোগের রেকর্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রসিকিউশন দল এই তথ্যগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করবে। এ ধারা অনুসারে, যদি দোষী প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্টদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করা হতে পারে।
মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে ২৫ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। এই তারিখে উভয় অভিযুক্তের আইনজীবী ও সাক্ষীদের বক্তব্য শোনা হবে এবং অতিরিক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে। আদালত এই সেশনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রায়ের পূর্বে আরও তদন্তের অনুমতি দিতে পারে। বিচার প্রক্রিয়ার সময় উভয় পক্ষকে সমান সুযোগ প্রদান করা হবে এবং আন্তর্জাতিক আইনের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
ইন্টারনেট বন্ধের আদেশটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া হয়েছিল, যা দেশের প্রধান শহরগুলোতে এবং গ্রামীণ এলাকায়ও প্রভাব ফেলেছিল। বন্ধের সময়কাল প্রায় দুই মাস স্থায়ী ছিল, যার ফলে সামাজিক মিডিয়া, সংবাদ সাইট এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রবাহ সম্পূর্ণরূপে থেমে যায়। সরকার এই পদক্ষেপকে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ রক্ষার জন্য দাবি করলেও, মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটি তথ্যের স্বাধীনতা লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করেছে। এই প্রেক্ষাপটে সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলকের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
এই মামলার ফলাফল দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। যদি উভয়কে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তবে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক পরিবারে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা হবে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ পদক্ষেপের সম্ভাবনা কমে যাবে। অন্যদিকে, যদি রায়ে অব্যাহতি দেওয়া হয়, তবে সরকারী সংস্থার তথ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুনরায় শক্তিশালী হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি বাড়বে এবং বাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষার জন্য চাপ বাড়বে।
এই সময়ে বাংলাদেশ সরকার, অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার, মামলার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। সরকারী সূত্রে বলা হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে চলবে এবং কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না। তবে, দেশের অভ্যন্তরে এই মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে গণহত্যার তথ্য লুকানোর অভিযোগে সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সাক্ষ্যগ্রহণে উভয় পক্ষের যুক্তি শোনা হবে এবং মামলার চূড়ান্ত রায়ের ভিত্তি গড়ে উঠবে। এই প্রক্রিয়া দেশের আইনি ব্যবস্থা, মানবাধিকার রক্ষা এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।



