বিএনপি‑এর নতুন সরকার গঠনের পর, পার্টির দীর্ঘদিনের সদস্য আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রথমবার সংসদে শপথ নিলেন এবং একই সঙ্গে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল জানার পর মঙ্গলবার ঢাকায় মন্ত্রিসভা গঠন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। পার্টির সভাপতি তারেক রহমান নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে শপথ গ্রহণের সময় মিন্টুর নাম উল্লেখ করে পরিবেশ সংরক্ষণে তার ভূমিকা তুলে ধরেন।
বিএনপি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই‑তৃতীয়াংশ আসন জয় করে সরকার গঠন করে, ফলে প্রথমবারের মতো পার্টির নেতা সংসদে প্রবেশ করেন। পার্টির নেতৃত্বের মতে, নতুন মন্ত্রিসভা দেশের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী নীতি নির্ধারণে সক্ষম হবে। সরকার গঠনের পর মন্ত্রিপরিষদে শপথ নেওয়া সদস্যদের মধ্যে মিন্টু অন্যতম, যাকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়েছে।
আবদুল আউয়াল মিন্টুর জন্ম ১৯৪৯ সালে ফেনী জেলার আলাইয়ারপুর গ্রামে। তিনি ফেনী পাইলট হাই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামের জুলদিয়া মেরিন একাডেমি থেকে নৌবিজ্ঞান ডিপ্লোমা অর্জন করার পর পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং কর্পোরেশনের বাণিজ্যিক জাহাজে ক্যাডেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
মিন্টু ১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত শিপিং কর্পোরেশনে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের প্রথমার্ধে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোর বন্দরে জাহাজে কর্মরত থাকায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযোদ্ধা ও সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যান।
যুক্তরাষ্ট্রে তিনি নিউইয়র্কের স্টেট ইউনিভার্সিটির অধীন মেরিটাইম কলেজে ভর্তি হন। ১৯৭৩ সালে পরিবহনবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৭৭ সালে পরিবহন ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এই সময়ে তিনি শিপিং শিল্পে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও একাডেমিক জ্ঞানকে একত্রিত করে আন্তর্জাতিক পরিবহন ক্ষেত্রে দক্ষতা গড়ে তোলেন।
প্রায় আট বছর নিউইয়র্কের একটি শিপিং কোম্পানিতে কাজের পর মিন্টু দেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসে তিনি শিপিং, রেস্তোরাঁ, ব্যাংক, বিমা, জ্বালানি, সিমেন্ট, পর্যটন, শিল্প, বিপণন, বীজ ও গবাদিপশু উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা শুরু করেন। তার উদ্যোগগুলো দেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বাড়াতে সহায়তা করেছে এবং বহু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
ব্যবসা ক্ষেত্রে তার নেতৃত্বের স্বীকৃতি পাওয়া যায় ১৯৯৮‑২০০০ এবং ২০০৩‑২০০৫ সময়কালে এফবিবিসিআই (বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন) এর সভাপতি হিসেবে। এই সময়ে তিনি বাণিজ্যিক নীতি ও শিল্প উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সমিতি ও ফোরামে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তার নেতৃত্বে এফবিবিসিআই ব্যবসায়িক পরিবেশের স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়াতে কাজ করেছে।
মিন্টু লেখক হিসেবেও পরিচিত। তিনি অর্থনীতি, রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ের উপর একাধিক বই প্রকাশ করেছেন। তার রচনায় “বাংলাদেশ: পরিবর্তনের রেখাচিত্র”, “বাংলাদেশ: অ্যানাটমি অব চেঞ্জ”, “সন্তানকে পিতার কথামালা” এবং “শাকসবজির চাষাবাদ” অন্তর্ভুক্ত। এই বইগুলোতে তিনি দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী‑৩ (সোনাগাজী ও দাগনভূঞা) আসনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে মিন্টু প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে জয়ী হন। তার জয় পার্টির জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে, কারণ তিনি ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ একজন নেতা, যাকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়েছে।
মিন্টুর মন্ত্রিপদ গ্রহণের ফলে সরকারে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসার সম্ভাবনা দেখা যায়। তার বাণিজ্যিক পটভূমি ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা পরিবেশ নীতি গঠনে বাজারভিত্তিক ও টেকসই পদ্ধতি প্রয়োগে সহায়তা করতে পারে। পার্টির অভ্যন্তরে এবং বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে এই নিয়োগকে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে মিন্টু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বনের সংরক্ষণ, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন তা দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। তার নেতৃত্বে মন্ত্রণালয় কীভাবে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিবেশ সুরক্ষার প্রকল্প চালাবে, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
সংক্ষেপে, আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রথমবার সংসদে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিযুক্ত হয়েছেন। তার দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক শিক্ষা এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দেশের পরিবেশ নীতি গঠনে নতুন দৃষ্টিকোণ আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার গঠন ও মন্ত্রিপদ গ্রহণের এই মুহূর্তটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।



