শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (স্যুস্ট) অটোড্রাইভ দল ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ম্যানুয়াল টেস্ট চালানোর প্রস্তুতি নিয়ে দেশের প্রথম স্বয়ংচালিত গাড়ি প্রোটোটাইপ উপস্থাপন করেছে। এই প্রকল্পটি স্যুস্টের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবুল বশার রজের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে। গাড়ির মূল কাঠামো, সাসপেনশন এবং উন্নত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ, যেখানে চালকের ভুল এবং অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতি বছর হাজারো গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি, ফলে নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন তীব্রতর হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি প্রযুক্তি একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
বিশ্বের বহু দেশ ইতিমধ্যে স্বয়ংচালিত প্রযুক্তি গ্রহণ করে রোড সেফটি ও ট্রাফিক দক্ষতা বাড়াচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের মাধ্যমে মানবিক ভুল কমে যায় এবং যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পরিবহন খাতের রূপান্তর ঘটাতে পারে, তাই বাংলাদেশকেও এই দিকটি অনুসন্ধান করা জরুরি।
স্যুস্ট অটোড্রাইভ দলের উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি ছিল রজের রোবোটিক্স ও অটোমেশন নিয়ে আগ্রহ। তিনি লক্ষ্য করেন যে, স্বয়ংচালিত গাড়ি প্রযুক্তি সর্বোচ্চ স্তরের স্বয়ংক্রিয়তা ধারণ করে এবং এর মূল উপাদানগুলো অন্যান্য শিল্পে প্রয়োগযোগ্য। তাই তিনি স্বয়ংচালিত গাড়ি গবেষণাকে দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে বেছে নেন।
রজের মতে, বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয় পোর্ট অপারেশন ও ফ্যাক্টরি অটোমেশনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রবণতার পিছনে রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে স্বয়ংচালিত গাড়ি প্রযুক্তি আয়ত্ত করা হলে, সংশ্লিষ্ট সিস্টেমগুলো সহজে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। ফলে লজিস্টিক্স, শিপিং এবং উৎপাদন খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আশা করা যায়।
প্রকল্পের তৃতীয় বর্ষে রজ দল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন এবং বিভিন্ন বিভাগ থেকে সহপাঠীদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো আর্থিক সহায়তা না থাকলেও, দলের সদস্যদের উদ্যম ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ২০২৪ সালে তারা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে দুই লাখ টাকা সংগ্রহ করে প্রথম ধাপের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল নিশ্চিত করে।
এই তহবিলের মাধ্যমে গাড়ির বডি স্ট্রাকচার এবং সাসপেনশন সিস্টেমের নকশা সম্পন্ন হয়। পাশাপাশি, গাড়ির চালনা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি উন্নত কন্ট্রোল ইউনিট তৈরি করা হয়, যা সেন্সর ডেটা প্রক্রিয়াকরণ ও গতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম। এই প্রযুক্তিগত ভিত্তি স্বয়ংচালিত গাড়ির মূল কার্যকারিতা নিশ্চিত করে।
দল বর্তমানে গাড়ির ম্যানুয়াল টেস্টিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা জুলাই মাসে শুরু হওয়ার কথা। টেস্টের সময় গাড়ির স্থিতিশীলতা, সাসপেনশন কার্যকারিতা এবং কন্ট্রোল সিস্টেমের রেসপন্স যাচাই করা হবে। সফল টেস্টের পর পরবর্তী ধাপে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর ও কম্পিউটিং ইউনিট সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সেন্সর সেটআপ এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহ এখন দলের প্রধান কাজ। এই উপাদানগুলো গাড়িকে রিয়েল-টাইমে পরিবেশের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম করবে, যা স্বয়ংচালিত মোডে রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি। তহবিলের ঘাটতি পূরণে দল বিভিন্ন উৎসে আবেদন চালিয়ে যাচ্ছে।
স্বয়ংচালিত গাড়ি প্রকল্পের সাফল্য দেশের রোড সেফটি ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। যদি এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা যায়, তবে চালকের ভুলজনিত দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এবং যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হবে। এছাড়া, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি পোর্ট ও ফ্যাক্টরি সেক্টরে প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
স্যুস্ট অটোড্রাইভ দলের উদ্যোগ দেশের প্রযুক্তি গবেষণার পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক গবেষণা ও ছাত্র-সৃষ্ট উদ্ভাবন দেশের শিল্পখাতে স্বয়ংক্রিয় সমাধানের ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। ভবিষ্যতে আরও গবেষণা ও তহবিলের সমর্থনে এই ধরনের প্রকল্পগুলোকে স্কেল আপ করা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, স্যুস্টের স্বয়ংচালিত গাড়ি প্রোটোটাইপ দেশের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির সম্ভাবনা প্রদর্শন করেছে। তহবিল সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং টেস্টিংয়ের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করলে, বাংলাদেশ রোড সেফটি ও শিল্প অটোমেশনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে।



