ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কাটজ ১৭ ফেব্রুয়ারি গাজার হিব্রু দৈনিকের আয়োজিত এক সম্মেলনে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী গাজার বর্তমান সীমা থেকে কোনো এক সেন্টিমিটারও পিছু হটবে না। এই অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ সমাপ্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের পরেও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
কাটজের মন্তব্যের ভিত্তি হল গাজার পূর্বাঞ্চলে ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ইসরাইলি বাহিনী যে সীমা পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল, সেটিকে “ইয়েলো লাইন” বলা হয়। তিনি জোর দিয়ে বলছেন, হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এবং তার টানেল নেটওয়ার্কের ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলি সেনারা বর্তমান অবস্থান বজায় রাখবে।
ইসরাইলের রক্ষণশীল অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে কাটজ উল্লেখ করেন, হামাসের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত গাজায় কোনো অস্ত্র বা টানেল রাখা যাবে না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “শেষ টানেল ধ্বংস না করা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাবে” এবং এই শর্ত পূরণ না হলে কোনো সামরিক প্রত্যাহার হবে না।
গাজার “ইয়েলো লাইন” মূলত ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ইসরাইলি বাহিনী যে সীমা পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল, সেটি নির্দেশ করে। সেই সময়ে গাজার কিছু অংশে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার শুরু হয়, তবে কাটজের মতে এই লাইনকে অতিক্রম করা মানে হামাসের অস্ত্রধারী অবস্থা স্বীকার করা হবে, যা ইসরাইলের নীতি বিরোধী।
ইসরাইলি ক্যাবিনেট সচিব ইয়োসি ফুচসের মতে, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের জন্য সরকার ৬০ দিনের সময় দেবে। এই সময়ের মধ্যে শর্ত পূরণ না হলে ইসরাইল পুনরায় সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছে। ফুচসের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গাজার বিভিন্ন অংশে চলমান বিমান হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে ইতিমধ্যে চুক্তি লঙ্ঘন করা হয়েছে।
অক্টোবর ১০, ২০২৫ থেকে গাজায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও ইসরাইলের বিমান হামলা এবং ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা চলমান। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই লঙ্ঘনকে গাজার মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ করার কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন, তবে ইসরাইলের দৃষ্টিতে এটি হামাসের অবকাঠামো ধ্বংসের অংশ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে কার্যকর হয়েছে। এই ধাপের অধীনে গাজা থেকে ইসরাইলি সেনাদের পর্যায়ক্রমিক প্রত্যাহার, ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকার পুনর্গঠন, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং গাজার প্রশাসন পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রত্যাহার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরাইলি বাহিনী ধীরে ধীরে গাজার বিভিন্ন জোন থেকে সরে যাবে, যাতে পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে মানবিক সরবরাহের প্রবাহ বাড়ানো এবং গাজার নাগরিকদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কাটজের সাম্প্রতিক মন্তব্য এই শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সামরিক প্রত্যাহার হবে না বলে জোর দিয়েছেন, যা ট্রাম্পের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যকে বিপন্ন করতে পারে।
ইসরাইলের দৃষ্টিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও “মহান মিত্র” হিসেবে বিবেচিত, তবে যুদ্ধকালে কিছু নীতি বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এই পার্থক্যকে কাটজ স্বীকার করে, ইসরাইল এখন স্বনির্ভরতা বাড়াতে অভ্যন্তরীণভাবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
অন্তর্দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ইসরাইল তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করার জন্য নতুন প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সংগ্রহের পরিকল্পনা চালু করেছে। এই পদক্ষেপগুলোকে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বাহ্যিক নির্ভরতা কমে যায়।
সামগ্রিকভাবে, গাজার “ইয়েলো লাইন” থেকে এক মিলিমিটারও পিছু না হটার ইসরাইলি অবস্থান ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলেছে। গাজার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, পুনর্নির্মাণ এবং মানবিক সহায়তার প্রশ্ন এখন ইসরাইলের কঠোর শর্তের ওপর নির্ভরশীল, যা আঞ্চলিক রাজনৈতিক গতিবিধিতে নতুন মোড় আনতে পারে।



