কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত ১৭ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে মার্কিন সরকার দ্বারা আয়োজিত শান্তি আলোচনার পর থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনী এখনও কম্বোডিয়ার ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি রয়টার্সকে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এই দাবি তুলে ধরেন এবং সীমান্তে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যৌথ সীমানা কমিশনের দ্রুত কাজের আহ্বান জানান।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতির পরও দুই দেশের সীমান্তে অবস্থা অস্থির রয়ে গেছে। মানেত উল্লেখ করেন যে, গত ডিসেম্বরের চুক্তি সত্ত্বেও থাইল্যান্ডের সৈন্যরা কম্বোডিয়ার সীমান্তের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে গভীরভাবে অবস্থান করছে, যা কম্বোডিয়ার সার্বভৌমত্বের সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, থাইল্যান্ডের সেনা শিপিং কন্টেইনার এবং কাঁটাতারের বেড়া ব্যবহার করে কম্বোডিয়ার গ্রামগুলোকে ঘেরে রেখেছে, ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের বাড়ি ছাড়তে পারছেন না। তিনি এটিকে “সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত” হিসেবে বর্ণনা করেন এবং এটিকে কেবল অভিযোগ নয়, বাস্তব পরিস্থিতি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
থাই সরকার এই অভিযোগকে অস্বীকার করে, দাবি করে যে সীমান্তে তাদের উপস্থিতি শান্তি রক্ষার উদ্দেশ্যে এবং কোনো ভূখণ্ড দখলের ইচ্ছা নেই। থাই কর্তৃপক্ষের মতে, সীমান্তে নির্দিষ্ট স্থানে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে যাতে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি কমে।
গত বছর জুলাই মাসে দুই দেশের ৮১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটেছিল, যার ফলে লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। এই ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়ে এবং ট্রাম্প ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর মধ্যস্থতায় অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসে দুই ধাপের অস্ত্রবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
তবে সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি এখনও সমাধান হয়নি। মানেত আশা প্রকাশ করেন যে, থাই নির্বাচনের ফলাফল জানার পর ৮ ফেব্রুয়ারি থাই নির্বাচনের সমাপ্তি ঘটার পর উভয় দেশ প্রযুক্তিগত পর্যায়ে সীমানা মাপজোকের কাজ শুরু করতে পারবে। তিনি জোর দেন যে, এই প্রক্রিয়া দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী শান্তির ভিত্তি গড়ে তুলবে।
মার্কিন সরকার এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে এবং থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার নেতাদের ওয়াশিংটনে একত্রিত করে “বোর্ড অফ পিস” বৈঠকের আয়োজন করেছে। বৈঠকে উভয় পক্ষকে সীমান্ত সংক্রান্ত বিরোধ সমাধানের জন্য যৌথ সীমানা কমিশন (JBC) গঠন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
মানেতের মতে, JBC গঠন হলে সীমান্তের বর্তমান অবস্থা, কন্টেইনার ও বেড়া স্থাপন, এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে। তিনি থাইল্যান্ডকে এই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পেতে আহ্বান জানান।
থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়নি, তবে থাই সরকার পূর্বে উল্লেখ করেছে যে তারা সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবে। এই অবস্থানকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা “সতর্কতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
অতীতের সংঘর্ষের স্মৃতি এখনও উভয় দেশের নাগরিকদের মধ্যে গভীরভাবে বেঁচে আছে। ২০২৩ সালে হুন মানেতের নেতৃত্বে কম্বোডিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে দু’দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে গরম হতে শুরু করেছে, এবং ওয়াশিংটন ও ন্যাপিয়নের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপ পুনরায় চালু হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত বিরোধ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। যদি যৌথ সীমানা কমিশন কার্যকরভাবে কাজ না করে, তবে ভবিষ্যতে পুনরায় সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অবশেষে, হুন মানেতের দাবি এবং থাইল্যান্ডের অবস্থান উভয়ই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে রয়েছে। মার্কিন সরকার এবং অন্যান্য প্রধান দেশগুলো এই বিরোধ সমাধানে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে প্রস্তুত, এবং পরবর্তী কয়েক মাসে সীমানা মাপজোক ও JBC গঠনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।



