ইরান মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, হরমুজ প্রণালীর একটি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত জানায়। রাষ্ট্রীয় মিডিয়া জানায়, এই পদক্ষেপটি ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সামরিক মহড়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র জেনেভা শহরে পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত আলোচনার জন্য একত্রিত হয়েছে, যা অঞ্চলের উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
হরমুজ প্রণালী মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য বিশ্ববাজারে তেল পরিবহনের প্রধান সমুদ্রপথ। ২০২৫ সালে এই রুটে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল গমন করেছে, যা বৈশ্বিক সমুদ্রপথে মোট ক্রুডের প্রায় ৩১ শতাংশের সমান। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রণালীকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অয়েল চোক পয়েন্ট’গুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হয়।
ইরানের এই প্রথম প্রণালীর অংশিক বন্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির প্রভাব রয়েছে। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন, যা ইরানকে হরমুজের কিছু অংশ বন্ধ করতে প্ররোচিত করে। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে সাময়িক সীমাবদ্ধতা আরোপের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
আলোচনার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘গাইডিং প্রিন্সিপলস’ নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তবে তিনি সতর্ক করে উল্লেখ করেন, এই সমঝোতা দ্রুত চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নেবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং এখনও বহু কাজ বাকি রয়েছে। এই মন্তব্যগুলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা এবং পারস্পরিক শর্তাবলীর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
হরমুজের সাময়িক বন্ধের ফলে তেল বাজারে প্রাথমিকভাবে মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়, তবে পরবর্তীতে দাম হ্রাস পায়। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল ১.৮ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৬৭.৪৮ ডলারে নেমে আসে, আর ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ০.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৬২.৬৫ ডলারে পৌঁছায়। এই মূল্য পরিবর্তনগুলো জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং হরমুজের কৌশলগত গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।
বিশ্ব জাহাজ মালিকদের সংগঠন বিমকোর নিরাপত্তা প্রধান জ্যাকব লারসেনের মতে, হরমুজের এই সাময়িক নিয়ন্ত্রণ বৃহৎ ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে না, তবে পারস্য উপসাগরমুখী জাহাজ চলাচলে কিছুটা বিলম্ব এবং সামান্য অসুবিধা হতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ইরানের নির্দেশনা মেনে চলার সম্ভাবনা বেশি।
অঞ্চলের সামরিক উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি বাজারের দৃষ্টিপাত এই আলোচনার ফলাফলের দিকে ঘুরে যায়। হরমুজের অংশিক বন্ধের ফলে শিপিং কোম্পানিগুলো বিকল্প রুট বিবেচনা করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রণালীর সম্পূর্ণ বন্ধের ঝুঁকি এখনও বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের জেনেভা আলোচনার অগ্রগতিতে, যা পারমাণবিক বিষয়ে অচলাবস্থা ভাঙার পাশাপাশি হরমুজের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রাখে।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়া কীভাবে বিকশিত হবে, তা হরমুজের কার্যক্রম এবং বৈশ্বিক তেল মূল্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলা এবং স্পষ্ট গাইডলাইন নির্ধারণই এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।



