দিল্লি ২০২৬ সালের প্রথম মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুটি বিশাল বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা দেশের বাণিজ্য নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। এই চুক্তিগুলোকে প্রায়ই “সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যদিও interim চুক্তির শর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অধিক সুবিধা রয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি “মাদার অফ অল ট্রেড ডিলস” এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে “ফাদার অফ অল ট্রেড ডিলস” নামে পরিচিত, যা ভারতের দশম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) হিসেবে গন্য। ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিকতা দেশের রক্ষামূলক বাণিজ্য নীতি থেকে একটি স্পষ্ট বিচ্যুতি নির্দেশ করে, যেখানে পূর্বে বহু বছর ধরে আলোচনায় অটকে থাকা চুক্তিগুলো এখন দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি, ভারত গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (GCC) এর ছয়টি সদস্য দেশের সঙ্গে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। GCC বিশ্বব্যাপী ভারতের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১৫% অংশ গঠন করে, ফলে এই আলোচনাগুলোকে কৌশলগত গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা এই চুক্তিগুলোকে ইতিবাচক সিগন্যাল হিসেবে স্বীকার করলেও, সেগুলোকে বাণিজ্য বৃদ্ধির একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখেন না। তারা উল্লেখ করেন যে, বাস্তবিক রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য গভীর বাণিজ্য সংস্কার এবং কার্যকরী বাস্তবায়ন প্রয়োজন, শুধুমাত্র চুক্তি স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়।
বাণিজ্য চুক্তির ব্যবহার হার নিয়ে বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতের FTA ব্যবহার হার প্রায় ২৫% মাত্র, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে এই হার ৭০% থেকে ৮০% পর্যন্ত পৌঁছায়। এই পার্থক্য মূলত ছোট ও মাঝারি শিল্পের ওপর অতিরিক্ত কাগজপত্র, অডিট ঝুঁকি এবং চুক্তির শর্তাবলী সম্পর্কে অপর্যাপ্ত জ্ঞানের কারণে ঘটে।
ইয়েস (EY) পরামর্শক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ভারতের FTA অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে রপ্তানি ৩১% বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে একই সময়ে আমদানি ৮২% বেড়েছে। এই বৈষম্যকে সংস্থা “বাজার প্রবেশের সুবিধা সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার না করা” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
২০২৩ সালের পর স্বাক্ষরিত অস্ট্রেলিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তিগুলো রপ্তানি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই উন্নতি মূলত উন্নত বাণিজ্য অবকাঠামো, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া এবং কার্যকরী পোর্টাল সিস্টেমের ফলাফল হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তবে, সামগ্রিকভাবে দেখা যায় যে চুক্তিগুলোর পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনের জন্য ভারতের বাণিজ্য নীতি ও প্রক্রিয়ার গভীর সংস্কার প্রয়োজন। কাগজপত্র হ্রাস, ডিজিটাল সেবা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা হলে ব্যবহার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
অবশেষে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্তে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ভারতকে কেবল চুক্তি স্বাক্ষরে সীমাবদ্ধ না থেকে, বাস্তবিক রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য কাঠামোগত পরিবর্তন এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে। এ ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপই দেশের বাণিজ্যিক অবস্থানকে স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করবে।



