বাংলাদেশ সরকার ২০২৫-২০২৬ আর্থিক বছরের (FY26) প্রথম সাত মাসে উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে, অন্তত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সময়কালে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো মোট ৫০,৫৫৬ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে, যা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP) মোট বাজেটের মাত্র ২১.১৮ শতাংশ।
তুলনামূলকভাবে, একই সময়কালে FY25-এ ব্যয় হার ২১.৫২ শতাংশ ছিল, আর FY24 ও FY23-এ যথাক্রমে ২৭.১১ এবং ২৮.১৬ শতাংশে রেকর্ড করা হয়েছে। এই ধারাবাহিক পতনকে আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হ্রাসের মাত্রা উদ্বেগজনক। মেডিকেল এডুকেশন ও ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার বিভাগ তাদের বরাদ্দের মাত্র ২.৯৮ শতাংশ ব্যবহার করতে পেরেছে, আর স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ৬.৫৯ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
গবেষণা ও নীতি সংহতি কেন্দ্র (RAPID)-এর গবেষণা পরিচালক মো. দিন ইসলাম উল্লেখ করেছেন, প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতার ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিচ্ছা ব্যয়ের ধীরগতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ক্রয় প্রক্রিয়ার কঠোর তদারকি ও সংশ্লিষ্ট ভয় পরিবেশের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে ঝুঁকি বাড়ছে।
এই ব্যয় হ্রাসের পটভূমিতে বাংলাদেশে আউট-অফ-পকেট স্বাস্থ্য ব্যয়ের অনুপাত বিশ্বে সর্বোচ্চের মধ্যে রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
একটি দীর্ঘস্থায়ী বা টার্মিনাল রোগের কারণে গরিব নয় এমন পরিবারও দ্রুত দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়তে পারে, এ বিষয়টি বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন।
বহু-সূচক ক্লাস্টার সমীক্ষা (MICS) থেকে প্রাপ্ত তথ্য দেখায় যে মূল স্বাস্থ্য সূচকগুলোতে কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেনি, যা নীতি নির্ধারকদের জন্য সতর্ক সংকেত।
বিশ্লেষকরা যুক্তি দেন, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের ত্বরান্বিত বৃদ্ধি না হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
উন্নয়ন ব্যয়ের এই ধীরগতি সরাসরি নির্মাণ, সরবরাহ চেইন এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক প্রবাহকে প্রভাবিত করছে। প্রকল্পের দেরি বা স্থগিত হওয়ায় সরবরাহকারী ও কন্ট্রাক্টরদের আয় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।
বাজেটের এই অপ্রত্যাশিত ঘাটতি সরকারকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আর্থিক ভারসাম্য রক্ষায় অতিরিক্ত চাপের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়াতে না পারলে জনমত ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব পড়তে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে, যদি উন্নয়ন ব্যয় পুনরায় ত্বরান্বিত না হয়, তবে স্বাস্থ্য সেবার গুণগত মান হ্রাস পাবে, যা শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা ও মানব উন্নয়নের সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অতএব, নীতি নির্ধারকদের জন্য জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান রয়েছে: স্বাস্থ্য খাতে আর্থিক বরাদ্দ বাড়িয়ে তা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে ব্যবহার করা, এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার চালু করা। এই ধরনের পদক্ষেপই দেশের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি মজবুত করতে সক্ষম হবে।



