অ্যাঙ্গোলার স্বাধীন সাংবাদিক তেইশেরা কাঁদিডো ২০২৪ সালে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে প্রেরিত ক্ষতিকারক লিঙ্কে ক্লিক করে তার আইফোনে ইন্টেলেক্সা কোম্পানির “প্রেডেটর” স্পাইওয়্যার ইনস্টল হয়। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই হ্যাকিংয়ের বিশদ তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, কাঁদিডোকে একাধিক সন্দেহজনক লিঙ্ক পাঠানো হয়, যার মধ্যে একটি লিঙ্কে ক্লিক করার পর তার ডিভাইস সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। হ্যাকিংয়ের সময় ব্যবহার করা সফটওয়্যারটি ইন্টেলেক্সা নামের নিষিদ্ধ স্পাইওয়্যার প্রস্তুতকারকের তৈরি, যা আন্তর্জাতিকভাবে নজরদারি এবং সাইবার আক্রমণের জন্য পরিচিত।
ইন্টেলেক্সা একটি বাণিজ্যিক নজরদারি সরবরাহকারী, যার গ্রাহক তালিকায় সরকারী সংস্থা অন্তর্ভুক্ত। কাঁদিডোর ক্ষেত্রে, একটি সরকারী গ্রাহকই এই সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে সাংবাদিকের ফোনে অনুপ্রবেশ করেছে বলে সংস্থা জানায়। এই ঘটনা স্থানীয় প্রেসের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
প্রেডেটর স্পাইওয়্যার পূর্বে মিশর, গ্রীস এবং ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হয়েছে। ঐ দেশগুলোতে সরকারী সংস্থা এই সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে বিদেশি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সমালোচক এবং সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। অ্যামনেস্টি উল্লেখ করেছে যে, এই ধরনের টুলের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে এবং লক্ষ্যবস্তুতে শুধুমাত্র রাজনীতিবিদ নয়, সাধারণ নাগরিকও অন্তর্ভুক্ত।
ইন্টেলেক্সা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক নজরে এসেছে তার জটিল কর্পোরেট গঠন এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে চলার কৌশলের জন্য। কোম্পানিটি একাধিক বিচারব্যবস্থার অধীনে কাজ করে, যা তার কার্যক্রমের স্বচ্ছতা কমিয়ে দেয় এবং আইনি বাধা অতিক্রম করতে সহায়তা করে। এই গোপনীয়তা নিয়ে এক মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা মন্তব্যে “অস্বচ্ছ কর্পোরেট কাঠামো” উল্লেখ করেছেন।
২০২৪ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন ইন্টেলেক্সা এবং এর প্রতিষ্ঠাতা তাল দিলিয়ান, পাশাপাশি ব্যবসায়িক অংশীদার সারা আলেকজান্দ্রা ফাইসাল হামু-কে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল স্পাইওয়্যার বিক্রির মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ করা। নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরেও কোম্পানির কিছু শীর্ষ নির্বাহীকে মুক্তি দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে সেনেটের ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়ার দাবি উত্থাপন করে।
ট্রেজারি বিভাগ একই বছর তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, যদিও তাদের সংযুক্তি ইন্টেলেক্সার সঙ্গে ছিল। এই সিদ্ধান্তের ফলে ইন্টেলেক্সার অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও তার গ্রাহক নেটওয়ার্কের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তীব্র হয়। সেনেটের কিছু সদস্য এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা প্রকাশ করে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সময়কালের নীতি নিয়ে পুনর্বিবেচনা দাবি করে।
তালিয়ান দিলিয়ান, যিনি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান মুখ, এই বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তার অমীমাংসিত অবস্থান সংস্থার ভবিষ্যৎ কৌশল এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির নীতি নির্ধারণে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়।
এই হ্যাকিং ঘটনা অ্যাঙ্গোলার মিডিয়া পরিবেশে নতুন সতর্কতা সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিকরা এখন ডিজিটাল যোগাযোগের নিরাপত্তা নিয়ে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করছেন এবং স্পাইওয়্যার আক্রমণের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াচ্ছেন। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সরকারী গ্রাহকদের দ্বারা স্পাইওয়্যার ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানাচ্ছেন।
প্রেডেটর স্পাইওয়্যার এবং ইন্টেলেক্সার মতো সরবরাহকারীর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার বিশ্বব্যাপী প্রেসের স্বাধীনতা ও নাগরিক গোপনীয়তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ধরনের প্রযুক্তি যদি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়, তবে তা স্বতন্ত্র সাংবাদিকতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন শেষাংশে উল্লেখ করা হয়েছে, যে সরকারী গ্রাহকদের দ্বারা স্পাইওয়্যার ব্যবহার বন্ধ করা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা জরুরি। এ ধরনের পদক্ষেপই ভবিষ্যতে অনধিকারী হ্যাকিং এবং তথ্য চুরির ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে।



