বেরলিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (বেরলিনালে) সম্পর্কিত একটি উন্মুক্ত চিঠিতে ৮১ জন শিল্পী গাজা অঞ্চলে চলমান সংঘাতের প্রতি নীরবতা প্রকাশের অভিযোগ তুলেছেন। তিল্ডা সুইন্টন, হাভিয়ের বার্ডেম, তাতিয়ানা মাসলনি এবং আদাম ম্যাককে সহ আন্তর্জাতিক পরিচিত অভিনেতা-পরিচালকদের নাম তালিকায় রয়েছে। চিঠিটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে প্রকাশিত হয় এবং সব স্বাক্ষরকারীই পূর্বে এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী আলুমনি হিসেবে পরিচিত।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গাজায় ইসরায়েল কর্তৃক চালিয়ে যাওয়া সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ ও ‘মানবতার অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত এবং শিল্প ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সহিংসতা থেকে দূরে থাকা উচিত। স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে অভিনেতা অ্যাঞ্জেলিকি পাপুলিয়া, সেলাহ বক্রি, পিটার মুলান, টোবিয়াস মেনজিস এবং পরিচালক মাইক লি, ন্যান গোল্ডিন, মিগুয়েল গোমেস, এভি মোগ্রাবি অন্তর্ভুক্ত। তারা সবাই একসাথে বলেছে যে, শিল্প সংস্থাগুলোকে প্যালেস্টাইনের প্রতি চলমান সহিংসতার সঙ্গে জড়িত কোনো সহযোগিতা থেকে বিরত থাকতে হবে।
চিঠির মূল দাবি হল, বেরলিনালের আয়োজক সংস্থাগুলোকে ইসরায়েলের ‘গণহত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধ’ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে নিন্দা জানাতে হবে, যেমন তারা ইতিমধ্যে ইরান ও ইউক্রেনের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যভাবে মন্তব্য করেছে। এই দাবি প্রকাশের পর শিল্প জগতের বিভিন্ন কোণ থেকে সমর্থন ও সমালোচনা উভয়ই দেখা গেছে, তবে বিশেষ করে গাজা সংকটের ওপর আন্তর্জাতিক মনোযোগের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
বেরলিনালে এই বছর রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসা হয়েছে, যা চলচ্চিত্রের স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পিক দিককে প্রায়ই উপেক্ষা করে। উৎসবের উদ্বোধনী প্রেস কনফারেন্সে জুরি প্রেসিডেন্ট উইম ওয়েন্ডার্সকে গাজা ও জার্মান সরকারের ইসরায়েলকে অস্ত্র বিক্রির সমর্থন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। ওয়েন্ডার্সের উত্তর ছিল, শিল্পীদের রাজনৈতিক বিষয় থেকে দূরে থাকা উচিত এবং চলচ্চিত্র নির্মাণকে ‘রাজনীতির বিপরীত’ হিসেবে দেখা উচিত। তার এই মন্তব্য অনলাইনে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করে এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ছড়িয়ে দেয়।
ওয়েন্ডার্সের বক্তব্যের পর কিছু বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন যে, ‘রাজনীতি’ শব্দের জার্মান অর্থ ‘নীতিমালা’ এবং তিনি সম্ভবত শিল্পকে নীতিমালা থেকে আলাদা রাখতে চেয়েছেন। তবে তার এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও, গাজা সংকটের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন ও নিন্দা প্রকাশের দাবি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণ হয়নি।
বেরলিনালে অংশগ্রহণকারী শিল্পী ও পরিচালকদের এই সমবায় পদক্ষেপটি গ্লোবাল চলচ্চিত্র শিল্পে মানবাধিকার ও নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্নকে তীব্র করে তুলেছে। তারা আশা করছেন যে, ভবিষ্যতে উৎসবের আয়োজক সংস্থা গাজা সংকটের মতো মানবিক জরুরি বিষয়গুলোকে উপেক্ষা না করে, সমানভাবে নিন্দা ও সমর্থন প্রকাশ করবে।
এই প্রতিবাদে উল্লেখযোগ্য যে, ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায়ের নামও উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও তার মন্তব্যের বিস্তারিত প্রকাশিত হয়নি। তার সমর্থন এই আন্দোলনের আন্তর্জাতিক মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে এবং গ্লোবাল মিডিয়ায় বিষয়টির দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি করেছে।
বেরলিনালে এই বছর রাজনৈতিক আলোচনার প্রাধান্য চলচ্চিত্রের মূল বিষয়বস্তুকে প্রায়ই ছাপিয়ে গেছে, তবে শিল্পীদের এই সম্মিলিত চিঠি একটি স্পষ্ট সংকেত পাঠায় যে, মানবিক সংকটের মুখে শিল্পের নীরবতা আর সহ্য করা হবে না। ভবিষ্যতে এই ধরনের উদ্যোগগুলো শিল্পের নৈতিক দায়িত্বকে পুনর্নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



