বেরলিন চলচ্চিত্র উৎসবে জার্মান পরিচালক অ্যানজেলা শ্যানেলেকের নতুন নাটক ‘মাই ওাইফ ক্রাইজ’ (Meine Frau weint) প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে প্রথমবারের মতো প্রদর্শিত হয়েছে। ছবিটি একটি দম্পতির বিচ্ছেদের প্রান্তে থাকা সম্পর্ককে কেন্দ্র করে, যেখানে স্বীকারোক্তি, অস্থিরতা এবং তীব্র আকাঙ্ক্ষা একত্রে ফুটে ওঠে। শ্যানেলেক, যিনি ৬৪ বছর বয়সী, এই কাজের মাধ্যমে রোমান্টিক ট্র্যাজেডির রূপে তার স্বতন্ত্র শৈলীকে পুনর্নির্মাণ করেছেন।
চলচ্চিত্রটি জার্মান ভাষায় নির্মিত, তবে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফরাসি অভিনেত্রী আগাথে বোনিটজার, যিনি জার্মান ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলেন। বোনিটজার পাসকেল বোনিটজার ও প্রয়াত সোফি ফিলিয়ের্সের কন্যা, এবং তার পারফরম্যান্সকে সমালোচকরা দৃঢ় ও প্রামাণিক বলে প্রশংসা করেছেন। তিনি এমন এক তরুণীকে উপস্থাপন করেন, যিনি প্রেম থেকে দূরে সরে গিয়ে তার সিদ্ধান্তের পরিণতি স্বীকার করতে বাধ্য হন।
‘মাই ওাইফ ক্রাইজ’ এর কাস্টে ভ্লাদিমির ভুলেভিচ, বার্টে শ্নোইংক, পলিন রেবম্যান, বেন কার্টার, থোরবজর্ন বর্নসন, ক্লারা গস্টিনস্কি এবং লর-লুসিল সিমন অন্তর্ভুক্ত। ভ্লাদিমির ভুলেভিচের চরিত্র থমাস, এক ক্রেন অপারেটর, ছবির সূচনায় আট মিনিটের একটি স্থির শটের মাধ্যমে পরিচিত হয়। তিনি ধূসর নির্মাণ অফিসে বসে ফোন চেক করছেন এবং অদৃশ্য চরিত্রের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন; এই দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের ধীরগতি ও ন্যূনতমবাদী শৈলীর সূচনা করে।
শ্যানেলেকের পূর্ববর্তী কাজগুলো—‘মিউজিক’, ‘আই ওয়াজ অ্যাট হোম, বাট…’, ‘দ্য ড্রিমড পাথ’—কে তুলনা করলে দেখা যায়, নতুন ছবিটি তুলনামূলকভাবে সরল রোমান্সের কাঠামো গ্রহণ করেছে। তবে তা মানে নয় যে ছবিটি বাণিজ্যিক রোমান্সের মতো হালকা; বরং এটি শিল্পময় ন্যূনতমবাদ এবং গূঢ় দার্শনিক প্রশ্নের সমন্বয়। শ্যানেলেকের শৈলী এখনও সূক্ষ্ম ও বিমূর্ত, তবে এই চলচ্চিত্রে তিনি দর্শকের জন্য কিছুটা স্পষ্টতর বর্ণনা রেখেছেন।
চলচ্চিত্রের মোট দৈর্ঘ্য এক ঘণ্টা তেইশ মিনিট, যা আধুনিক আর্ট হাউস সিনেমার মানদণ্ডের মধ্যে স্বল্প। ছবির বর্ণনা প্রধানত দম্পতির মধ্যে ঘটে যাওয়া সংলাপ ও অশাব্দিক মুহূর্তের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে দৃশ্যাবলি প্রায়ই দীর্ঘ একক শটে গঠিত। এই পদ্ধতি দর্শকের মনোযোগকে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে কেন্দ্রীভূত করে, যদিও কিছু দর্শকের কাছে এটি দূরত্বপূর্ণ মনে হতে পারে।
‘মাই ওাইফ ক্রাইজ’ এর থিমেটিক ফোকাস হল সম্পর্কের শেষের মুহূর্তে উদ্ভূত আত্ম-পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎকে মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন। ছবিতে দেখা যায়, দুজনের মধ্যে অবশিষ্ট থাকা স্নেহ ও বিরক্তি একে অপরের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যা কখনও কখনও তীব্র চিৎকারে রূপ নেয়, আবার কখনও নীরব দৃষ্টিতে। এই দ্বৈততা শ্যানেলেকের চলচ্চিত্রে প্রায়ই দেখা যায়, যেখানে আবেগের তীব্রতা ও শৈল্পিক শীতলতা একসাথে মিশে থাকে।
বিনোদন জগতের বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, এই চলচ্চিত্রটি সীমিত দর্শকগোষ্ঠীর জন্যই উপযুক্ত হতে পারে, কারণ এর ধীরগতি, দীর্ঘ শট এবং বিমূর্ত বর্ণনা সাধারণ বাণিজ্যিক সিনেমার চেয়ে ভিন্ন। তবু, যারা শিল্পচলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী, তাদের জন্য এটি একটি মূল্যবান অভিজ্ঞতা প্রদান করে। বোনিটজারের পারফরম্যান্স, শ্যানেলেকের দৃষ্টিকোণ এবং ছবির ন্যূনতমবাদী চিত্রায়ন একত্রে একটি অনন্য সিনেমাটিক পরিবেশ গড়ে তুলেছে।
বেরলিন চলচ্চিত্র উৎসবে ‘মাই ওইফ ক্রাইজ’ এর অংশগ্রহণ জার্মান চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। ছবিটি শিল্পময় দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পর্কের জটিলতা ও মানবিক দুর্বলতাকে তুলে ধরেছে, যা দর্শকের মধ্যে গভীর প্রতিফলন জাগাতে পারে। যদিও এটি সকলের পছন্দের না হতে পারে, তবে চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা ও বর্ণনামূলক গঠনকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
সামগ্রিকভাবে, ‘মাই ওইফ ক্রাইজ’ একটি সংযত ও শিল্পময় রোমান্টিক ট্র্যাজেডি, যেখানে ফরাসি অভিনেত্রীর জার্মান ভাষায় পারফরম্যান্স এবং শ্যানেলেকের স্বতন্ত্র শৈলী একত্রে কাজ করেছে। ছবির দীর্ঘ শট, ন্যূনতমবাদী দৃশ্য এবং গভীর মানবিক থিমের সমন্বয় এটিকে একটি বিশেষ ধরণের চলচ্চিত্র করে তুলেছে, যা শিল্পচলচ্চিত্রের অনুরাগীদের জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।



